মঙ্গলবার, ০৩ অগাস্ট ২০২১, ১১:১০ অপরাহ্ন

একাত্তরের কথা

রির্পোটারের নাম / ১৩১ বার
আপডেট সময় : শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

দিগন্ত ডেক্স : মার্চ মাস এলেই টিভিতে মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শহীদ পরিবারের স্বজনদেরকে ডেকে ডেকে ১৯৭১ এর স্মৃতি বলতে বলা হয়। ঘুরে ফিরে কিছু মানুষের কাহিনীই আমরা বারে বারে শুনি। কিন্তু শুধু তারাই কেন শোনাবেন? একাত্তরে এদেশে মারা গেছে ৩০ লক্ষ মানুষ, আমাদের তো ৩০ লক্ষ গল্প থাকার কথা। অন্তত ৩০ লক্ষ সাহসিকতার গল্প। সে সময় বাঙালি ছিলো সাড়ে সাত কোটি, তত কোটি গল্প কি আমরা শুনেছি?

একাত্তরের কথা শুনলেই আমরা মনে করি ভীষণ কষ্টে ভরা এক সময়ের কথা, রক্ত হত্যা, মৃত্যু, সব মিলিয়ে এক বিভিষীকাময় সময়ের কথা। কিন্তু যে গল্পটা সে সময়ের প্রজন্ম আমাদেরকে শোনায় না সেটা হলো আমাদের অসম সাহসিকতার গল্প। অসংখ্য বীরের গল্প। একাত্তর বাঙ্গালিদের মাঝে মানুষ হিসেবে সেরা অংশটুকু বের করে এনেছিল। এমনকি রাজাকার নামের যে পিশাচগুলো তাদেরও পিশাচসত্ত্বার সবচে কদর্য অংশটুকু তখনই বের হয়ে এসেছিল। মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন সম্মুখসমরে, সাধারণ বাঙালি পরিবারগুলো তাদেরকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন, যুদ্ধের ঝাপটা সয়েছেন। প্রতিটা পরিবারেরই রয়েছে ৭১ এর কিছু না কিছু গল্প। এই গল্প গুলো আমরা কতটা সংরক্ষণ করেছি বা আদৌ শুনেছি কি না জানি না। কিন্তু কেবল দেশের ইতিহাস হিসেবেই নয়, পারিবারিক ইতিহাস হিসেবেও এগুলো আমাদের সংগ্রহে রাখা উচিত। ১৯৭১ পেরিয়ে আসা এই মানুষগুলো যখন আর থাকবেন না তখন এই গল্পগুলো আর কোথায় পাওয়া যাবে?

আমার পরিবারের চৌদ্দ গুষ্টির বেশিরভাগই মুক্তিযোদ্ধা, এমন দাবি আমি করতে পারি না। আমি নেহাতই সাধারণ পরিবারের মানুষ, তবু আমার বাবা মা একাত্তর দেখে এসেছেন, তাদের ছোট ছোট গল্প আছে। ছোটবেলায় কোন এক লোডশেডিং এর অন্ধকারে গল্প করতে করতে আব্বা বলেছিলেন ১৯৭১ এর কিছু স্মৃতি। খুব সাধারণ গল্প কিন্তু এটাই তো আমি গর্ব করে আমার সন্তানকে বলে যেতে পারব। একাত্তরে বাবার পুরো পরিবার রাজশাহী শহরের বাড়ি ফেলে পালিয়েছিলেন গ্রামে। সরকারি চাকুরে দাদাকে প্রানের ভয়ে অফিসে হাজিরা দিতে হয় নিয়মিত, তিনি কর্মস্থলে, এর মাঝে খবর এলো পাকবাহিনী রাজশাহীর বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, আব্বা তখন স্কুলে পড়েন। ছোট ছেলেকে আর্মি কিছু বলবে না ভেবে তাকে পাঠানো হল ক্ষয় ক্ষতি দেখে আসতে। পথে রাজশাহী বাজারের কাছে আব্বা কিছু পাক আর্মির হাতে ধরা পড়ে গেলেন, এরা তাকে হাত, চোখ বেধে মারধর করে একটা বিল্ডিং এ আটকে রাখলো। সেখানে নাকি আরও মানুষ ছিল যাদেরকে ধরে এনেছিল। কিছুক্ষণ পর পর এক দু জন করে বের করে নিয়ে যাচ্ছিলো এবং গুলির শব্দে বুঝা যাচ্ছিলো তাদের মেরে ফেলা হচ্ছে। লিকলিকে আব্বা কোনভাবে মোচড়ামুচড়ি করে বাধন খুলে ফেলেন। তারপর দেখতে পান, জানালার একটা শিক আলগা, সেটা কিভাবে যেন ম্যানেজ করে শিক গলে পালিয়ে দেন ভোঁ দৌড়। রাজাকাররা দেখতে পেয়ে পিছে ছুটে আসে, আব্বা বাজারের লোকের মাঝে মিশে যান এবং চট করে গেঞ্জির উপরে পড়ে থাকা শার্ট টা খুলে ফেলে দেন। ফলে রাজাকারের দল আর আলাদা করে চিনতে পারে না কাকে তারা খুঁজছিলো। তাদের চোখের আড়ালে এসেই এক ছুটে আবার গ্রামের বাড়িতে এসে পড়েন আব্বা।

এটা খুবই সাধারণ একটা গল্প ১৯৭১ এর । এরকম লক্ষ লক্ষ মানুষকে রাজাকার পাক বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। কিন্তু যখন শুনি আমার আব্বাকে রাজাকার ধরে নিয়ে যাচ্ছে, আমার বুক কেঁপে উঠে। যখন শুনি একটু বাদে মেরে ফেলবে,আমার গলার কাছে কি যেন আটকে যায়। যখন আব্বা পালাতে পারেন, তখন পাহাড় সরে যায়। শার্ট পালটে ফেলে রাজাকারদের ধোকা দেয়ার কথা শুনে হেসে ফেলি আর তার উপস্থিত বুদ্ধি আর সাহসের কথা ভেবে গর্ব হয়।

এই গল্পটা অনেক আগে মুখে মুখে শোনা, অনেক খুটিনাটি আব্বাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি। সেগুলো জিজ্ঞেস করে আমি এই ঘটনা গুলি লিখে রাখব। যেমন কবে রাজাকাররা বাড়ি পোড়ালো, কবে, কোথায় রাজাকাররা আব্বাকে ধরে নিয়ে গেলো। ক্যাম্পটা কোথায় ছিল। যাদের মেরেছিল বা ঐ সব রাজাকার কারও নাম জানেন কি না? এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু স্রেফ আপনার পরিবারের আনন্দ বেদনা সাহসের কাহিনী আপনার বংশধরকে জানাবার জন্যও কি লিখে রাখা জরুরি নয়?

ইতিহাস একা কেউ লিখে না। ইতিহাস নকশী কাথার মত। অনেক গুলো ছোট ছোট ফোঁড় দিয়ে পুরো কাহিনীটা তৈরি হয়। আমাদের ইতিহাসের ছোট ছোট ফোঁড় গুলো আমাদেরই সংগ্রহ করে রাখতে হবে কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার আগেই। আমার বাবার যেমন গল্প আছে, আমার মায়েরও আছে, আমার দাদী, ফুপু, শ্বশুর-শাশুড়ী, এমনকি বাসার ঠিকা বুয়া তারও একটা গল্প আছে। এই গল্প গুলো সাজালে কি চমৎকার একটা ছবি যে আমরা পাব ভেবেই আমার ভালো লাগে। অনেক অনেক দিন এইসব গল্প কেউ শুনতে চায়নি। পুরানো ইতিহাসের কথায় বিরক্ত অধৈর্য্য হয়েছে মানুষ। এতদিন ধরে যে ব্যাথা , যে কথা তারা তুচ্ছ ভেবে বুকের ভিতরে চেপে চুপচাপ আগলে রেখেছেন সেগুলো এখন আমরা আদর করে নিজেদের সংগ্রহে তুলে রাখতে হবে, নাইলে পরের প্রজন্মকে কে এসব গল্প বলবে।

 

 


এ জাতীয় আরো খবর
Developed By ThemesDealer.Com