শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন

আদিবাসী আন্দোলন প্রসঙ্গ ও কিছু কথা

রির্পোটারের নাম / ৮০ বার
আপডেট সময় : রবিবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

ডেক্স নিউজ : গত ১৭ই জানুয়ারি ২০২০ আদিবাসী ইউনিয়ন এর কেন্দ্রীয় সভা গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বিগত ২০০৫ এ আদিবাসী ইউনিয়ন এর যাত্রা শুরু। বিগত ২০১৩ সালে প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, সিরাজগঞ্জে । এ সম্মেলনে সংগঠনের ঘোষনা পত্র, দাবিনামা ও গঠনতন্ত্র গৃহীত হয়। সম্মেলনে আদিবাসী নারী নেত্রী রেবেকা সরেন সভাপতি মনোনীত হন। কার্যকরী সভাপতি হয়েছিলেন খগেন্দ্র হাজং যিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। একটি ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠিত হয়।রেবেকা সরেন নওঁগাও জেলার ভীমপুর নিবাসী আলফ্রেড সরেনের বোন। শহীদ আলফ্রেড সরেন ভুমি অধিকার সংগ্রামে নৃশংস ভাবে নিহত হন। এভাবেই খুন হয়েছেন সত্যবান হাজং, কল্পনা চাকমা, পীরেন স্নাল সহ অনেকে। কিন্ত বিচার হয় নি।

আদিবাসীরা পাহাড় ও সমতলে বসবাস করে। সমতলে মূল আদিবাসী জনগোষ্ঠী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের। আদিবাসীদের ভেতর এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ (৮০%)। এরা বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলের অধিবাসী। পাহাড়ীদের বসবাস পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা রাঙামাটি, খাগরাছড়ি ও বান্দরবনে। এদের ভেতর চাকমারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলাদেশে আদিবাসী জনসংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ। যদিও বিগত আদমসুমারি অনুযায়ী পনের লক্ষ। এদের সংখ্যা নগন্য দেখাতে সরকার আগ্ৰহৗ!! কিন্তু কেন!?

আদিবাসী বিতর্ক
আদিবাসী নাম নিয়ে একটু বিতর্ক আছে। আমার সাধারন ধারনা বিষয়টি আসছে বন, ভূমি ও প্রকৃতির সাথে তাদের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। এখানে কারা এ অঞ্চলে প্রথমে বসতি স্থাপন করেছে তার সাথে সম্পর্কিত নয়।

আদিবাসী সংক্রান্ত আইএলও ১৬৯ (১৯৮৯) সিদ্ধান্ত নিম্মলিখিত বিষয়গুলো স্বীকৃতি দিয়েছে :- এই প্রস্তাবে দশটি অংশ আছে সাধারন রীতি, ভূমি, কর্মসংস্থান বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, হস্তশিল্প, গ্রামীন শিল্প, সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ মাধ্যম, আন্ত: সীমান্ত যোগাযোগ, প্রশাসন, সাধারন বিধান এবং চূড়ান্ত বিধানবলি, মোট চুয়াল্লিশটি ধারা।

আর্ন্তজাতিক শ্রম সংগঠন তার ১৬৯ সিদ্ধান্তের (১৯৮৯) ভেতর দিয়ে আদিবাসী বিষয়ে তাদের সংজ্ঞা পরিষ্কার করেছেন। ”আদিবাসী তারাই যাদের নৃতাত্ত্বিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দেশের অন্য জনগোষ্ঠী থেকে পৃথক এবং তাদের অবস্থা পুরোপুরি বা আংশিকভাবে তাদের নিজস্ব আচার আচরন/ রীতিনীতি, ঐতিহ্য বা বিশেষ আইন ও নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কোন রাষ্ট্রে তাদের আইনগত অবস্থা যাই হোক না কেন, তারা তাদের নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সমূহ সংরক্ষণ করছেন এবং তারা নিজেদের আদিবাসী বা ভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী হিসাবে চিহ্নিত করলে সেটাই মৌলিক সূচক হিসাবে পরিগনিত হবে।

যে কোন জাতীয় সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য হল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে নিয়মানুগ ব্যবস্থা পরিচালনা, তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা ও তাদের জাতিগত অখন্ডতা রক্ষা করা। তারা এ রাষ্ট্রে অন্য সকল নাগরিকের সাথে সমান আইনসংগত সাংগঠনিক অধিকার ভোগ করবেন। রাষ্ট্ব তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষা করবে এবং তাদের সামাজিক সাংষ্কৃতিক পরিচয়, রীতিনীতি (আচার আচরন, পোষাক পরিচ্ছদ), মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার, আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ এবং তাদের সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে। মূল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সাথে যে কোন সামাজিক অর্থনৈতিক ব্যবধান যদি থাকে তা সর্ম্পূণভাবে মুছে ফেলার উদ্যোগ গ্রহণ করবে।”

বাংলাদেশের অভ্যুদয়
পাকিস্তান ছিল একটি কৃত্রিম ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র। বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়েছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, মানবিক গনতান্ত্রিক ও বৈষম্য হীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের স্বপ্নকে সামনে রেখে। তাই এ নতুন রাষ্ট্রে আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার স্বীকৃতি পাবে এটাই ছিল স্বাভাবিক প্রত্যাশা! কিন্তুু সংবিধান প্রণয়নের শুরুতে এ বিষয়ে মত ভিন্নতা দেখা দিয়েছিল। এ প্রেক্ষিতে জন সংহতি সমিতির (১৯৭৩ প্রতিষ্ঠিত ) প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা প্রতিবাদ করে সংসদ বর্জন করেন এবং পরে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। যতদুর জানা যায় পাকিস্তান আমলে তিনি নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির সান্নিধ্যে এসেছিলেন। এ থেকে তিনি সমাজতান্ত্রিক চিন্তার পক্ষে বাম ধারায় কাজ করে গেছেন।

পরবর্তীতে ভূরাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে উঠে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি অঘোষিত যুদ্ধক্ষেত্র! জেনারেল জিয়ার আমল থেকে সমতলের বাঙালি বিশেষতঃ মুসলিমদের এখানে বসতি স্থাপনে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়। শুরু হয় জুম্ম জনগনের ( যারা জুম পদ্ধতিতে চাষ করেন) উপর অত্যাচার, খুন, বাড়ী ঘর জ্বালিয়ে দেয়া, লুটপাট। আদিবাসী নারীদের গুম ও ধর্ষন হয়ে দাড়ায় এ এলাকার নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা! এই প্রশাসনিক ও মিলিটারি ব্যবস্থা এখনও চলছে। বাংলাদেশ শাসকরা কোন সময়ই কেন পার্বত্য চট্টগ্রামে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করে তার কোন স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এদেশের জনগণের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন নি।

মূল সমস্যাগুলো কি? :

১)পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়া এবং পার্বত্য এলাকায় অব্যহত নির্যাতন, খুন, লুটপাট, নারীর উপর অত্যাচার চলতে থাকা! কোন গনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান টেকসই ভাবে গড়ে তুলতে রাষ্ট্রের চরম অসহযোগিতা! পার্বত্য অঞ্চলে ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আপাত: শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু শান্তি চুক্তি আজ পর্যন্ত পুরো বাস্তবায়ন হয় নি। তাছাড়া পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর ভূমি দখল রোধ, বাংলাদেশ সেনাবহিনীর ঐ অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা পরিহার, সাধারন পাহাড়ীদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন বন্ধ হয় নি । নারী’র উপর সহিংসতা নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হিসাবে চলছে তা রোধে কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করতে দেখা যাচ্ছে না। অবিলম্বে পাহাড়ে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করা অত্যাবশ্যকীয় হিসাবে আমাদের সামনে বিরাজ করছে। যে সব পাহাড়ী আদিবাসী বাস্তুচ্যুত হয়েছেন তাদের পুর্নবাসিত করা। তাছাড়া আদিবাসী এলাকসমূহ সংরক্ষিত রাখা একটি অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় কাজ।

২)বাংলাদেশ সরকার আইএলও সিদ্ধান্ত ১৬৯ স্বাক্ষর না করা এবং বাংলাদেশে কোন আদিবাসী জনগোষ্ঠী নেই এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকা।

৩)জাতিসঙ্ঘ বাস্তবায়িত বিভিন্ন শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে আকর্ষণীয় বিষয়। জাতিসংঘের নীতি অনুযায়ী আদিবাসী অধ্যুষিত দেশে তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি কেমন তার উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় সেই দেশের শান্তি রক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের উপযোগিতা। ঐ শর্ত অনুযায়ী আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্বকারি নেতৃত্বের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় এ সংক্রান্ত সুপারিশ। স্বাভাবিক ভাবেই বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকা বা সমতলের মূল নেতৃত্বের কাছ থেকে আদিবাসীদের অত্যাচার বা বঞ্চনা নেই এ ধরনের সুপারিশ পাওয়া খুবই কঠিন। তাই বাংলাদেশ সরকার আদিবাসী নেই এ পথটিই বেছে নিয়েছেন।

৪)আদিবাসীদের ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সমর্থনে চরম অনীহা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাব। এখানে ৪৪টি ভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী রয়েছে এদের ভেতর ৩৪টি ভাষার প্রচলন আছে। এখানে ২০১৭ সালে চাকমা, ককবরক, মার্মা ও সাদরি ভাষা প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোয় প্রচলন করা হয়েছে। ঐ সময়ে দুশ দশটি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি করা হয়। কিন্তুু প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরনের অভাবে এ উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পরেছে। তাছাড়া সমতলের প্রধান আদিবাসী জনগোষ্ঠী সাঁওতালদের ভাষা শেখার কোন উদ্যোগ এখনও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আদিবাসীদের ভেতর সাঁওতালদের সংখ্যা আশি শতাংশ।

৫)বাংলাদেশে আদিবাসী জনসাধারন সাধারভাবে খুবই দরিদ্র, বঞ্চিত ও অসহায়। বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে পিছিয়ে পড়া পাহাড়ী ও সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা বরাদ্দ থাকলেও তা প্রকৃত দু:স্থ দরিদ্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে পৌছায় না। তাছাড়া বরাদ্দের পরিমান অপ্রতুল আর এ সব বরাদ্দে চলছে চরম দুর্নীতি।

৬)আদিবাসীদের প্রধান সমস্যা ভুমির উপর তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া। সমতলের আদিবাসীদের ভূমি কমিশন গঠনের দাবি বহুদিনের। এখন পর্যন্ত ঐ দাবি সরকারের কাছে কোন গুরুত্ব পায়নি ।

বাংলাদেশের সংবিধান : বাংলাদেশের সংবিধান প্রথম অংশ ধারা ৬(২)’তে বলা হয়েছে বাংলাদেশের সকল নাগরিকই বাঙালি বলিয়া বিবেচিত হবেন, অন্যদিকে দ্বিতীয় অংশ ধারা ২৩ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিতে বলা হয়েছে রাষ্ট্র আদিবাসীদের ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা, সম্প্রদায় এবং কমিউনিটির অন্যন্য স্থানীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশে সহযোগিতা করবে।প্রথমত: বাংলাদেশের সকল নাগরিকই বাঙালি নয়, আর এ দুটি ধারা সাংঘর্ষিক।

আদিবাসী সংগঠনসমূহ : আদিবাসীদের কিছু রাজনৈতিক সংগঠন রয়েছে যেমন- জনসংহতি সমিতি, ইউপিডিএফ ও আদিবাসী ফোরাম, প্রথম দুটো পাহাড়ী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আন্দোলন, লড়াই, সংগ্রাম পরিচালনা করছে। আদিবাসী ফোরাম সকল আদিবাসীদের রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে অঙ্গীকারবদ্ধ হলেও, সমতলে তাদের কার্যক্রম খুব দৃশ্যমানভাবে অগ্রসর হতে দেখা যায়নি। এর বাইরে আদিবাসী পরিষদ একটি গণসংগঠন হিসাবে কাজ করছে। একসময় বামপস্থীদের সমর্থনে সমতল বিশেষত: সাওতালদের ভেতর কাজ শুরু করে। সমতলে আদিবাসীদের ভেতর এর কার্যক্রম বিস্তৃৃত আছে। বিভিন্ন সময় তারা উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে তাদের আন্দোলনের দাবি আদায়ে সমাবেশ, সম্মেলন, মিছিল আয়োজন করে থাকে।

এছাড়া আদিবাসীদের সমর্থনে বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। কিন্তুু এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে আদিবাসী দরিদ্র জনসাধারনের প্রকৃত অবস্থার কতটুকু উন্নতি হয়েছে সে বিষয়ে জনমনে বিভিন্ন জিজ্ঞাসা রয়েছে।

এছাড়া সরকারের special affairs division টিএনও অফিসের মাধ্যমে কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে। এখানে আদিবাসী সম্প্রদায়ের কিছু সুযোগ সন্ধানী ব্যক্তিবর্গ ঞঘঙ অফিসে অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজসে সরকারি বরাদ্দ নিয়মিতভাবে লুটপাট করছে। এ ধরনের দূর্নীতির ফলে প্রকৃত দরিদ্র আদিবাসীরা স্বল্প সরকারি সাহায্য যেটাই থাকুক না কেন তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। অদিবাসী সংসদীয় ককাস আছে। মাঝে মাঝে সভা হয় । মিডিয়াতে খবরও প্রকাশিত হয় । এর বেশী কিছু হয় না ।

বাংলাদেশে কিছু গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠন, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবি, সচেতন ব্যক্তিবর্গ তারা আদিবাসীদের সংগ্রামে আছেন ও এই আন্দোলন শক্তিশালী হোক তার জন্য সচেষ্ট থাকেন।

আদিবাসীদের সাথে প্রস্তাবিত আলোচনা : এখানে একটি বিষয়ে আদিবাসীদের সাথে আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন যে যদিও একটি রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে এবং অসাম্প্রদায়িক, গনতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের আকাঙ্খা থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল। কিন্তুু বিগত ৪৯ বছরে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী পুঁজিপতি শ্রেনীর আর্বিভাব ঘটেছে। যারা এদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থার উপর তাদের সর্ম্পূন একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। এক্ষেত্রে এদেশের সকল ধরনের আইন কানুন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, আদালত, সরকারী অফিস, প্রশাসন ব্যবস্থা সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রনে। সবই এই শ্রেনীর স্বার্থে পরিচালিত, এর ফলে অল্প সংখ্যক লোক ধনী হচ্ছে । বিদেশী গবেষণা সংস্থার ২০১৯’র হিসাব অনুযায়ী ২৩৪টি সুপার ধনী পরিবার বাংলাদেশের অধিকাংশ সম্পদ তাদের হাতে কুক্ষিগত করেছে। এর বিপরীতে কোটি কোটি বাংলাদেশের মানুষ যার অধিকাংশ বাঙালি মুসলমান তারা দরিদ্র, অতিদরিদ,্র অসহায়, অত্যাচারিত, নির্যাতিত ও বঞ্চিত। এই সব বঞ্চিত মানুষের সংগ্রাম চলছে। তার ভেতর চড়াই উৎরাই আছে,বাঙালি দরিদ্র বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও আদিবাসীদের জাতিসত্তার অধিকার ও রুটি রুজির সংগ্রাম একই সূত্রে গাঁথা। টঙ্ক, তেভাগা, নানকার, তেলেঙ্গানা এসব এক সূত্রে গাথা। আদিবাসীদের লড়াই আর বামপন্থা এক ধারায় প্রবাহিত।

এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার কোন র্শটকাট সম্ভাবনা নেই। অল্প কিছু লোক পুরো জনগোষ্ঠীর স্বার্থের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে নিজেদের স্বার্থ কিছু আদায় হয়তো করতে পারে। সে রকম কিছু সুবিধাবাদী, লুটেরা, দূর্নীতিবাজ চরিত্রের একটি ছোট শিক্ষিত আদিবাসী অংশের আর্বিভাব ঘটেছে। কিন্তুু এর ভেতর সমগ্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মুক্তি সম্ভব নয়। প্রতিবৎসর ৯ই আগষ্ট আর্ন্তজাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপিত হয়, এর জাতীয়, আর্ন্তজাতিক তাৎপর্য রয়েছে। কিন্তু এটি একটি মেকি, দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে পরিনত হয়েছে। কিছু অসাধু দুর্নীতিবাজ আদিবাসী ঐ দিন কিছু টাকার লোভে দিবসের জন্য দিবস পালন করে। দরিদ্র বঞ্চিত আদিবাসীদের এই দিবস পালনে কোন লাভ হচ্ছে না। এই রূঢ় সত্য আদিবাসীদের কাছে বলতে হবে।
তাই আন্দোলন, প্রতিবাদ, সমাবেশ এগুলোর ভেতর দিয়ে আদিবসাীদের সংগ্রাম অগ্রসর করতে হবে। এর ফলে এসব খবর মিডিয়াতে প্রকাশিত হবে। বুজোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার উপর সামাজিক চাপ সৃষ্টি হবে, দাবি দাওয়া নিয়ে দরকষাকষি হবে, কিছু সফলতা আসবে। ঐ সকল আন্দোলনের ভিত্তির উপর দাড়িয়ে আগামী দিনের পথে মেহনতি জনতার স্বার্থে অসাম্প্রদায়িক, মানবিক গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে, এই লড়াই’এ আদিবাসীদের সাথে হাত মেলাবে এ দেশের মেহনতি জনতা, গণতান্ত্রিক বাম রাজনৈতিক সংগঠন, বিভিন্ন গনসংগঠন , গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ রাজনৈতিক কর্মী ও প্রগতিশীল বৃদ্ধিজীবিরা, এভাবেই অগ্রসর হতে হবে।

আদিবাসীদের সংগঠন : সংগঠন গড়ে তোলা তাই একটি অবশ্য করনীয় হিসাবে আদিবাসীদের সামনে এসে দাড়িয়েছে। তাই আগামী দিনে আদিবাসী ইউনিয়নের কার্যক্রম অগ্রসর করতে হলে এর ১৫ দফা দাবিনামা আদিবাসীদের ভেতর প্রচার করতে হবে। এই দাবিসমূহ যথা আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার, ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার, ভূমি অধিকার, পরিবেশ ও বন রক্ষা, পার্বত্য চুক্তি অবিলম্বে বাস্তবায়ন, বিভিন্ন রাজনৈতিক, গনসংগঠন, স্থানীয় সরকার ও সংসদে আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব, চাকুরিতে আদিবাসী কোটা, একশ দিনের কাজ, ভিজিএফ (VGF), কৃষিখাতে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ ইত্যাদি জরুরি । সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন গঠন, আই এল ও ১০৭ ও ১৬৯ অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করার দাবি জনপ্রিয় করে তুলতে হবে।

এ লক্ষ্যে প্রতিটি এলাকায় মানবন্ধন, সভা, সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন, কমিটি গঠন, সদস্য সংগ্রহ এবং আদিবাসী নারীদের অংশগ্রহন জোরাল করার পদক্ষেপ নিতে হবে। আদিবাসী সম্প্রদায় বিশেষত: সমতলের আদিবাসীদের ভেতর আদিবাসী ইউনিয়নের কর্মতৎপরতা বাড়িয়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে। এভাবে অগ্রসর হলে আগামীতে একটি বড় জাতীয় সমাবেশ আয়োজনে করে দাবি আদায়ে অগ্ৰসর হতে আমরা পদক্ষেপ নিতে সফল হব।

আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ভাই র (গোবিন্দগঞ্জ) তাগাদায় ও উদ্যোগে মিটিং শেষে ১৭ই জানুয়ারী বিকেলে আমরা (রেবেকা সরেন, মিহির ঘোষ, আলতাফ হোসেন, মহসিন রেজা, ইসমাইল হোসেন, বদিউজ্জ্জ৷মান, জয়নাল খান, শ্রী কান্ত মাহাতো, ওয়াজিউর রাফায়েল, অশোক আগরওয়াল ও আরো অনেকে ) বাগদা ফার্মে পৌছাই। শত শত নারী পুরুষ সমাবেশ স্থলে উপস্থিত। বেশীর ভাগই নারী। শীতের দিন বেশীর ভাগেরই গায়ে কোন চাদর নেই। ভাবি, সরকার বলে দেশে উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু এরা কেন সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত!? এখানেই তিন বছর আগে আগুন লাগানো ও তিনজন আদিবাসী নিহত হওয়ার পর আমরা সংহতি জানাতে উপস্থিত হয়েছিলাম । এখানে ১৮০০ একর জমি সাওতালদের কাছ খেকে অধিগ্ৰহন করা হয়েছিল আখের আবাদ করার জন্য। এখন এ জমি যে কাজে অধিগ্ৰহন করা হয়েছিল তা’না করে অন্যদের কাছে র্দীঘমেয়াদী লীজে হস্তান্তর করা হচ্ছে। আদিবাসীদের আপত্তি এখানেই। যে কারনে জমি অধিগ্ৰহন করা হয়েছিল তা যদি না হয় তাহলে তাদের র্পূব পুরুষের জমি তাদের কাছে হস্তান্তর করা হোক এই তাদের দাবী।

মিটিং শেষে ফিরে আসার সময় ভাবি, আদিবাসী ও বাঙালী মেহনতি মানুষের লড়াই যত দানা বাধবে ততই মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ তথা আমাদের মুক্তি সংগ্রামের স্বপ্ন প্রতিষ্ঠার লক্ষে আমরা অগ্রসর হয়ে যাব। গোবন্দিগঞ্জে আদিবাসী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভা আদিবাসীদের সেই আন্দোলন ও সাংগঠনিক কাজ অগ্রসর করার জোর তাগিদ দিয়েছে।

তথ্যসূত্র : বিশিষ্ট সমাজসেবক ডা. দিবালোক সিংহ, সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।

The Constitution of Peoples Republic of Bangladesh as amended in 2011,ILO-C169-Indigenous and Tribal People’s Convention, 1989 (No 169), Chottagong Hill Tracts Peace Accord 1997

 


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesWala.Com