শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০, ০১:১৯ পূর্বাহ্ন

পথে নামো পথে হাঁটো, অধিকার আঁদায়ে লড়াই করো !

রির্পোটারের নাম / ২১৪ বার
আপডেট সময় : রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯

ডেক্স নিউজ : “দুঃশাসন হঠাও, ব্যবস্থা বদলাও, বিকল্প গড়ো, গ্রাম-শহরের গরিব মানুষ এক হও, লড়াই কর”–এই আওয়াজ নিয়ে মাসব্যাপী বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এর পদযাত্রা চলছে। তৃণমূল মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে তার দাবি-দাওয়া নিয়ে সংগ্রাম গড়ে তোলা এবং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সিপিবির বক্তব্য গণমানুষের সামনে তুলে ধরাই এ যাবৎকালে এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।

প্রায় ২০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি পথ অতিক্রম করেছে এই পদযাত্রাগুলো। সিপিবির প্রায় সব জেলা সংগঠনই এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে এটাই প্রতীয়মান হচ্ছে সাধারণ মানুষ সিপিবির বক্তব্য শুনছে। নানা ধরনের মন্তব্যও করছে। বেশ কিছুদিন আগেও দেশের মানুষ ভাবতো সিপিবি বা বামপন্থিরা এদেশে কিছু করতে পারবে না, এখন বলছে, আপনারা শক্তি বাড়ান বর্তমান সরকার যেভাবে স্বৈরাচারি কায়দায় দেশ চালাচ্ছে তা মেনে নেয়া যাচ্ছে না। এই সরকারের বিরুদ্ধে প্রধান বিরোধীদলেরও তেমন কোনো আন্দোলন নেই। লুটেরা ধনিক শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করছে এই বুর্জোয়া দলগুলো। আপনারাই (সিপিবি বা বামপন্থি) কিছু করলে করতে পারবেন। মানুষর মাঝে কিঞ্চিৎ হলেও আশাবাদ তৈরি হচ্ছে। এই পদযাত্রা কর্মসূচিতে অসংখ্য হাটসভা, পথসভা সমাবেশ হয়েছে। দেশের মানুষ একটা পরিবর্তন চাচ্ছে, এটা সুস্পষ্ট হচ্ছে। সমস্যা হলো এই পরিবর্তন করবে কারা? এই পরিবর্তনের দায়িত্ব নিতে হবে বামপন্থিদেরই। সমস্যা থাকবে, এটা মোকাবিলা করতে হবে। এই পদযাত্রা কর্মসূচির একটা বড় দৃষ্টিভঙ্গী ছিল তৃণমূল পর্যায়ে জনজীবনে সমস্যা নিয়ে লড়াই সংগ্রাম গড়ে তোলা। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেক কমরেডই ধরতে পারছেন না। এই কর্মসূচিতে যেমন জাতীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে তেমনি তৃণমূলের স্থানীয় বঞ্চিতদের দাবি-দাওয়া নিয়ে ব্যাপক লড়াই সংগ্রাম গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।

কর্মসূচিতে সিপিবির সকল নেতাকর্মী সমর্থকদের সম্পৃক্ত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। অভিজ্ঞতা হলো- যেখানেই পদযাত্রা কর্মসূচি দু-একটা করার সিদ্ধান্ত ছিল পরবর্তীতে তা বেড়ে গিয়েছে। যেখানে নেমেছে কমরেডরা সেখানেই উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের পার্টি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিকল্প বাম গণতান্ত্রিক শক্তির উত্থানের কথা বলে আসছে। সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টি এবং শ্রমিক কৃষক ক্ষেতমজুরসহ সমাজের নানা শ্রেণিপেশার মানুষের সংগ্রামকে জোরদার করা। পদযাত্রা কর্মসূচিতে জনগণের ভোটাধিকার কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় দখলমুক্ত করা, শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ১৬০০০/- টাকা নির্ধারণ, ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামের উর্ধ্বগতি রোধ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের ওপর জুলুম-নির্যাতন বন্ধ, ফসলের লাভজনক দাম, ভারতের সাথে জাতীয় স্বার্থবিরোধী অসম চুক্তি বাতিলসহ ১৭ দফা দাবি সিপিবির পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে।

এই মুহূর্তে কৃষক ধানের দাম পাচ্ছে না। বেশি দামে কৃষি উপকরণ কিনে ধান চাষ করে কম দামে ধান বিক্রি করে দিচ্ছে। কৃষক অসহায়। তার পাশে আজ কমিউনিস্ট বামপন্থিদের দাঁড়াতে হবে। কৃষককে সংগঠিত করে তার ফসলের লাভজনক দামের দাবিতে ব্যাপক সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। ক্ষেতমজুরের পল্লী রেশনিং গ্রামীণ প্রকপ্লের লুটপাটের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে। শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ১৬০০০/- টাকা করার আন্দালন, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানসহ নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে লড়াই যেমন গড়ে তুলতে হবে তেমনি ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রের সংগ্রাম, সীমাহীন লুটপাট, দুর্নীতি-দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই সমান্তরালভাবে চালাতে হবে। বাম জোট ও পার্টির নানা ধরনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি থাকবে সেগুলো যেমন বাস্তবায়ন করতে হবে তেমনি ধরাবাহিকভাবে লেগে থেকে তৃণমূলের সংগ্রামও চালাতে হবে। সিপিবির সদস্যদের বেশি সংখ্যায় সম্পৃক্ত করা সময়ের দাবি। জেলা-উপজেলা শাখা নেতৃত্বকে পরিকল্পিতভাবে এ কাজটি সম্পন্ন করতে হবে। যারা (কমরেডরা) লড়াই সংগ্রামে অংশ নিচ্ছে না তাদের সম্পর্কেও চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। শুধুমাত্র পদযাত্রা কর্মসূচিই নয়, গ্রামে গ্রামে, কল-কারখানায়, সমাবেশ, বিক্ষোভ, ডেপুটেশন অবরোধ অবস্থানসহ নানা ধরনের কর্মসূচিও আমাদের গ্রহণ করতে হবে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এটা জরুরি হয়ে পড়েছে। শাসক গোষ্ঠী গণআন্দোলনকে দমানোর চেষ্টা করবে। জেলজুলুম হামলা মামলা থাকবে, তা প্রতিরোধ করতে হবে। কমিউনিস্ট বামপন্থি নেতাকর্মীরা গাঁ বাঁচিয়ে কর্মসূচি পালন করবেন তা হতে পারে না। সাহসিকতার সাথে দমন পীড়ন নির্যাতন প্রতিরোধ করতে হবে।

ইতোমধ্যেই ঢাকা, জামালপুর, শেরপুরে পদযাত্রা কর্মসূচিতে শাসক দলের সন্ত্রাসী এবং পুলিশ হামলা করেছে। বিভিন্ন স্থানে পদযাত্রার কর্মসূচিতে পুলিশ বাধা দিয়েছে। তা উপেক্ষা করেই পদযাত্রা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এই ডিসেম্বর মাসেও পদযাত্রা অব্যাহত থাকবে। এই পদযাত্রাগুলোতে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সেটা কিভাবে সম্ভব? এটা সম্ভব এভাবেই- স্থানীয় দাবিদাওয়ার বিষয়গুলো এই কর্মসূচিতে যুক্ত করে নিলে সাধারণ মানুষ ওই পদযাত্রায় আসবে। সারা দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক হতাশা ক্ষোভ বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ এমন একটা রাজনৈতিক শক্তি চায় যা তাকে এই অবস্থা থেকে মুক্ত করবে। এই শক্তি হচ্ছে বামপন্থি কমিউনিস্টরা। তাই আজ বামপন্থিদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কমরেডদের এটা উপলব্ধিতে আনতে হবে।

এই ডিসেম্বর মাসেই সিপিবির নবায়ন ও স্ক্রুটিনি শুরু হয়েছে। প্রত্যেকটি শাখাকে এই পদযাত্রা কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। শাখা ছোট হলে আরও শাখা যুক্ত করে এই কর্মসূচি পালন করতে হবে। শুধুমাত্র পদযাত্রা কর্মসূচিই নয়- এই কর্মসূচির মাঝে স্থানীয় দাবি-দাওয়া নিয়ে ইউএনও, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ঘেরাও বিক্ষোভ ডিপুটেশন কর্মসূচিও নিতে হবে।

ইতোমধ্যেই সিপিবির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, এই শীত মৌসুমেই ঢাকায় বড় ধরনের সমাবেশ হবে। আন্দোলনমুখী এই সমাবেশে কৃষক, শ্রমিক, ক্ষেতমজুর, ছাত্র, যুবক, সংস্কৃতিকর্মীসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষকে উপস্থিত করাতে হবে। সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচারণা চালাতে হবে আমরা স্থানীয়ভাবে দাবি-দাওয়া তুলে ধরছি, তা ঢাকায় আমরা তুলে ধরবো। কৃষকের ফসলের দাম ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ক্রয় কেন্দ্র ও খাদ্য গুদাম নির্মাণের দাবিতে যে সংগ্রাম, ক্ষেতমজরের পল্লী রেশনিং, গ্রামীণ প্রকল্প লুটপাটের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরির দাবির আন্দোলন, যুবকের কর্মসংস্থানের আন্দোলন সকল আন্দোলনকে এই সমাবেশের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। এইভাবেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আমাদের অগ্রসর হতে হবে। আমরা সাধারণ মেহনতি মানুষের পাশে আছি। তারাও আমাদের পাশে আছে। এখন শুধু সমন্বয় জরুরি হয়ে পড়েছে। এটা আমাদের করতেই হবে। বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটাতেই হবে। দুঃশাসন হঠাতে হবে। শুধুমাত্র গদির বদল নয় নীতি ও ব্যবস্থারও পরিবর্তন ঘটাতে হবে। ইতিহাস অর্পিত দায়িত্ব আমাদের পালন করতেই হবে কমরেড। লেখক : সহ-সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesWala.Com