বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০, ০৩:৫৭ অপরাহ্ন

যুবকরা কেন যুব ইউনিয়ন করবে?

রির্পোটারের নাম / ১২৭ বার
আপডেট সময় : রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯

ডেক্স নিউজ : ‘বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন বাংলাদেশের সকল যুবক তরুণ-তরুণীর সামাজিক, অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ, রাজনৈতিক ও অন্যান্য ন্যায্য অধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠা, তাদের সমস্যার সমাধান, যুব সমাজকে দেশপ্রেমিক ও জাতীয় কর্তব্য পালনে উদ্বুদ্ধ করা, তাদের জাতীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক সংস্কৃতিক মানের বিকাশ সাধন, দেশবাসীর প্রকৃত মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে এবং দেশের ব্যাপক বিকাশের স্বার্থেই সামাজিক ন্যায় ও শোষণহীন সমাজ কায়েম তথা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যুব সমাজকে যথাযথ ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে। বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন বাংলাদেশের যুবক তরুণ-তরুণীকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় সচেতন, সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করতে সচেষ্ট থাকবে।

বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন বাংলাদেশের যুব সমাজের একটি গণসংগঠন।’ এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন ১৯৭৬ সালের ২৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আজ অবধি নিরলসভাবে কাজ করছে। স্বাধীনতার প্রায় ৪৮ বৎসর পর কেমন আছে আমার প্রিয় স্বদেশ, স্বদেশের মানুষ, তথা যুব সমাজ। ১৯৭১ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। বর্তমানে ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় সতের কোটি। এই বিপুল জনগোষ্ঠির যুব সমাজের একটি বড় অংশই বেকার। অর্থাৎ সংখ্যায় প্রায় তিন কোটি। এই বিপুল সংখ্যক বেকার নিয়ে দেশ বেকারত্বের এক জলন্ত চুল্লিতে বসে আছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতি বছর আরো বিশ থেকে বাইশ লক্ষ যুবক শ্রম বাজারে প্রবেশ করছে। এই দেশের যুবকদের অদম্য সাহস ও ত্যাগের ভূমিকা পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে আছে। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তর পর্যন্ত সকল সংগ্রামে যুবকরা সাহসী ভূমিকা রেখেছে। দেশের প্রায় সমস্ত অর্জনের পেছনে যুবকরা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে।

যুবকরা যেহেতু সময়ের সাহসী যোদ্ধা সমাজের ও রাষ্ট্রের ভীত তৈরি করে তাই তাদের জন্য যুগ উপযোগী জাতীয় যুবনীতি দরকার। যেই নীতির মাধ্যমে যুবকরা যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাবে। যারা পাবে না তারা যথাযথ কাজ বা চাকরি পাবার আগ পর্যন্ত বেকার ভাতা পাবে। দক্ষ মানবসমাজ তৈরি করবে। সমাজের নানাস্তরে তারা ছড়িয়ে পড়বে। সব ক্ষেত্রে তারা নেতৃত্ব দেবে, দেশ এগিয়ে যাবে। এর মাধ্যমে যুবকরা যেমন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হবে তেমনী সৎ রাজনীতিবিদ হবে। অর্থাৎ দেশের স্বার্থে সকল কাজের পাহারাদার হবে। দেশ আজ এক ভয়ংকর অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে। সুশাসন নাই, ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট, মারামারি, হানাহানি, গুম হত্যা, সাম্প্রদায়িকতা ইতাদি বিরাজমান। তরুণ-যুব সমাজের ভবিষৎ আজ লুট হয়ে যাচ্ছে। লুট হচ্ছে দেশের সম্পদ, ব্যাংক, শেয়ার বাজার, দখল হচ্ছে জনগণের সম্পদ। এই লুটেরা পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী সরকার থেকে এই সব দাবি আদায় করতে হলে যুব সমাজকে জাগতে হবে, জাগাতে হবে। এই কাজটি করতে দেশপ্রেমিক যুব সমাজ দরকার। আর সে কাজটি করে এবং করবে যুব ইউনিয়ন। বাংলাদেশের অপারাপর যুব সংগঠন তার মুরব্বী দলের লেজুড়বৃত্তি ছাড়া আর কিছুই করে না একথা প্রমাণিত।

একটি দেশের অর্থনীতি যখন বাড়ে তখন সেটির কর্মপরিধিও বাড়ে। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও শ্রম বাজারে এত খাত ছিল না। প্রযুক্তি, বায়ো টেকনোলজি, থ্রিডি প্রিন্টিং, ই-কর্মাস, মোবাইল, ব্যাংক, বীমা ইত্যাদির বিষয় অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে। একথা প্রমাণিত দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি করতে পারলে, কাজের সুযোগ করে দিতে পারলে বাড়তি বিনিয়োগ ছাড়া ভাল প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। মালয়েশিয়ার মত দেশ জিডিপির ২৩ শতাংশ বিনিয়োগ নিয়ে এত উন্নতি করছে। উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বাড়লে জিডিপির প্রবৃদ্ধিও বাড়ে। যুবকরা শুধু চাকরিই করবে না তারা উদ্যোক্তাও হবে। দেশের সফল নেতৃত্বে আসবে। নতুন নতুন উদ্ভাবনে মনোনিবেশ করবে। এইরকম একটি সমাজ ব্যবস্থার জন্য যুবকরা লড়বে, আন্দোলন সংগ্রাম করবে। আমাদের মেরুদণ্ড আজ নানা রোগে আক্রান্ত। শিক্ষা হয়েছে পণ্য, বাণিজ্যের একটা জায়গা। কি হতে চান? ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিবিএ, এমবিএ সব হওয়া যায় খালি টাকা থাকলে। ১ম শ্রেণি থেকে উচ্চতর শ্রেণির সব জায়গায় প্রশ্ন ফাঁস হয়। নতুন নতুন বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগ হয়। কিন্তু কর্ম উপযোগী মানসম্পন্ন কোনো শিক্ষাব্যবস্থা হয় না। এব্যাপারে সরকারে কোনো ভাবনাও নেই। প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় আসে এক একটি শিক্ষনীতি চালু করে, ইতিহাস রচনা করে, ছাত্র-ছাত্রীরা বিভ্রান্ত হয়। কোচিং বাণিজ্যের পোস্টারে ছেয়ে গেছে সারা বাংলাদেশ। শিক্ষা অধিদপ্তর, টেক্সট বুক, শিক্ষক নিয়োগ, পরিচালনা কমিটি সব ক্ষেত্রে চলছে ঘুষ, দুর্নীতি ও দলীয়করণ। শিক্ষা ব্যবস্থা হচ্ছে পরীক্ষা ও ফল নির্ভর। চলছে গোল্ডেন পাওয়া ও দেওয়ার প্রতিযোগিতা। অবাক লাগে আপনি সৃজনশীল প্রশ্ন করেন অথচ সৃজন শক্তি বাড়ানোর জন্য কিছুই করেন না।

সাহিত্য চর্চা, পত্রিকা পড়া, বই পড়া, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, বির্তক প্রতিযোগিতা ইত্যাদি করেন না। অধিকাংশ স্কুলে খেলাধুলার মাঠও নেই। শুধু পরীক্ষা আর পরীক্ষা। ১ম থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত প্রতি শ্রেণিতে ১২-১৪টি বিষয়ে পড়ানো হয়। অথচ তার উপরের শ্রেণিতে এত বিষয়ে পড়ানো হয় না। অথচ হওয়ার কথা তার উল্টো। আর ক্যারিকুলামতো কতটি সরকারও জানে কিনা সন্দেহ! বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী পড়াশোনা করলে কাজ পাওয়ার সুযোগ কম। আর না করলে সুযোগ বেশি। বিসিএস পরীক্ষায় একটি পদের বিপরীতে প্রায় ৭০ জন পরীক্ষা দিয়ে থাকে। সরকার হিসাবে বেকারের সংখ্যা ছাব্বিশ লক্ষ- এযে পাগলের প্রলাপ। যুক্তরাজ্যের ইকোনোমিক্স ইন্টিলিজেনস্্ ইউনিটের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রীধারী বেকার। তাহলে বোঝা যায় আমরা কি পরিমাণ শিক্ষিত বেকার তৈরি করছি। বিসিএসের হিসাব মতে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে কর্মক্ষম শ্রম শক্তি ছয় কোটি সাত লাখের মধ্যে। এর মধ্যে পরিবারের মধ্যে কাজ করেন, মজুরি পান না এক কোটি এগারো লক্ষ। আর যাদের কাজের নিশ্চয়তা নেই দিনমজুর এদের সংখ্যা প্রায় সোয়া এক কোটি। সরকারি হিসাব মতে তরুণ বেকার সবচেয়ে বেশি দশ দশমিক চার ভাগ। এর মধ্যে নারীদের হার আরো বেশি ১৫ শতাংশ। উচ্চ শিক্ষিত বেকারত্ব এক ভয়াবহরূপ নিয়েছে। এই বেকার যুবকদের হতাশা এবং দুদর্শার ভয়াবহতা নিজে এবং পরিবারকে বহন করতে হয়। আর এর সুযোগ নেয় তথাকথিত রাজনীতিবিদ, প্রতারক চক্র, ভুয়া চাকরি দাতা, আদম বেপারী ও মাদক ব্যবসায়ীরা। এই যুবকদের তারা হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে। দলীয়করণ, ঘুষ, দুর্নীতি এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে নিজের দলের লোকদের কাছ থেকেও টাকা নেয়। দলীয়করণের কারণে প্রশাসনে দক্ষ লোকের অভাব দেখা দিয়েছে।

সৎ ও যোগ্য লোকেরা চাকরি না পেয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। সরকার বলছে সরকারের বিভিন্ন পদে ঊনষাট হাজার দুইশত একষট্টিটি পদ খালি আছে। অথচ এগুলি পূরণ করার কোনো উদ্যোগ নেই। সরকারের ও প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রিতাই এর জন্য দায়ী। ক্ষমতায় আসার আগে বলা হয় ঘরে ঘরে চাকরি দেব। ক্ষমতায় গেলে সব ভুলে যায়। চাকরি না দিয়ে অসহায় যুবকদের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত করে। বাংলাদেশের সরকারি ও বিরোধী দল শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি করে। জনগণের দুঃখ দুর্দশা লাঘবের রাজনীতি করে না একথা প্রমাণিত। দেশের এই অবস্থা চলতে থাকলে ২০৩৫ সালে বেকারের সংখ্যা দ্বিগুণ হবে। দেশে সুশাসন না থাকায় স্বাধীনতার চার মূলনীতি আজ ভূলুন্ঠিত। অসম্প্রদায়িক চেতনা আজ সাম্প্রদায়িকতায় রূপ নিয়েছে। যেখানে সাম্যের কথা বলা ছিল সেখানে দিন দিন ধনী ও গরিবের ব্যবধান বাড়ছে। সরকার বলছে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। বিপরীতে বৈষম্যও বাড়ছে। পরিশেষে বলতে চাই, এই বৈষম্য দূর করতে যুব সমাজের চাকরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এবং বিদেশি লুটেরাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে সাম্রাজ্য ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী একটি শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে যুব সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় সংসদ


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesWala.Com