শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২০, ০৮:৩২ অপরাহ্ন

সাহিত্য গবেষণায় – ‘‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’’

রির্পোটারের নাম / ৭১ বার
আপডেট সময় : শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯

ঐশিকা নদী : মঙ্গল শোভাযাত্রা গ্যালারির বাইরে বেরিয়ে আসা এমন একটি প্রদর্শনী, যা সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে প্রদর্শিত হচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে, মানুষের অংশগ্রহণ ততই বেড়ে চলছে। এ শোভাযাত্রা বাংলার নিজস্ব সম্পদ – লোকশিল্পকে তার চিরায়ত মহিমায় শহুরে শিল্প সংস্কৃতির সাথে একটি যোগসূত্র স্থাপন করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মঙ্গল শোভাযাত্রা যে শুধু নবীন, প্রবীণ শিল্পীদের একই সুতোয় গেঁথে চলেছে, তা নয়। পাশাপাশি, বাংলার নিজস্ব রূপলাবণ্যকে বিষয় করে – সাধারণ মানুষকে তার শেকড়ের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। আমার গবেষণার মূল ক্ষেত্র – প্রথমত, বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের ফলস্বরূপ – “মঙ্গল শোভাযাত্রা”র বিষয়ভিত্তিকভাবে শিল্প আন্দোলন হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপট। দ্বিতীয়ত, বাংলার শিল্পকলা ও সংস্কৃতির কৌলিন্য রক্ষার জন্য সেই উপনিবেশিক সময় এবং ঔপনিবেশিকতা-পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত বাংলার শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতিবাদী চেতনা, লড়াই এবং মঙ্গল শোভাযাত্রায় এর প্রতিফলন। তৃতীয়ত, গ্রামীণ শিল্পকলার হাত ধরে বাংলার শহরকেন্দ্রিক শিল্পীদের আধুনিক শিল্প-আন্দোলনের ফলসরূপ মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। চতুর্থত, মঙ্গল শোভাযাত্রা কিভাবে বিশ্বমানবতার স্বপক্ষে, ধর্মান্ধতার বিপক্ষে কাজ করে যাচ্ছে – তার ব্যাখ্যা এবং মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ বিষয়কে বিশ্বমানবতার ধারকরূপে বিশ্বস্বীকৃতি দেয়া, পাশাপাশি বর্তমান বিশ্বের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই শোভাযাত্রার প্রাসঙ্গিকতার ব্যাখ্যা। সাম্প্রতিক বিশ্বের সবচাইতে ভয়ঙ্কর মানবসৃষ্ট দুর্যোগের নাম সহিংস ধর্ম সন্ত্রাস। আর এ ধর্মসন্ত্রাস সকল যুগের, সকল সময়ের জন্য মানবসমাজের একটি নেতিবাচক দিক। যে কোনো ধরনের নেতিবাচকতা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনকে ব্যাহত করতে পারে।

সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতা সমাজের এমনই এক নেতিবাচক দিক, যা একটি জাতির জাতিগত পরিচয় ও অস্তিত্বকে ক্ষুণ্ন ও বিপন্ন করে দিতে পারে। মঙ্গল শোভাযাত্রা এই সাম্প্রদায়িকতার এই ভয়ালরূপের প্রতিবাদস্বরূপ প্রতিবছর রাজপথ প্রদক্ষিণ করে। সাম্প্রদায়িকতার ইংরেজি পরিভাষা কমিউনালিজম। দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিককালে বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যকার ধর্মীয় অস্তিত্বের লড়াইকে কেন্দ্র করে যে নৃশংসতার সৃষ্টি হয়েছিলো, মূলত সে সময় থেকেই এ অঞ্চলে কমিউনালিজম শব্দটি বুৎপত্তি অর্জন করে বা এ শব্দের বহুল ব্যবহার শুরু হয়। ব্রিটিশ উপনিবেশিক সময় থেকে শুধু ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কাতেই নয়, গোটা বিশ্বে তথা আফ্রিকা, আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া জুড়েই কমিউনালিজম একটি বড় সামাজিক সমস্যার নাম। ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রিটিশ সরকারের “উরারফব ধহফ জঁষব” নীতির ফলস্বরূপ এ ভারতবর্ষের মানুষের মাঝে এসেছিলো এক কালো অধ্যায়। ব্রিটিশ সরকারের এই নীতি সফল হলো, যখন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত আর পাকিস্তান নামের দুটো স্বাধীন দেশ ১৯৪৭ সালে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান পেলো। হিন্দু-মুসলিমের এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মানুষ হলো বাস্তুভিটাহীন, সহায়-সম্বলহীন। নির্যাতন, নিপীড়ন, উৎখাত ও দখলের পালাবদল শুরু হলো চারিদিকে। সেই সাথে স্বাধীন পাকিস্তানে বাঙালিদের শুরু হলো নতুন লড়াই। কারণ, আক্রমণ হয়েছিলো সরাসরি বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি আর সভ্যতার ওপর। তবে বাঙালি তার হাজার বছরে লালিত শিল্প-সংস্কৃতি বিপন্ন হতে দেয়নি। রুখে দাঁড়িয়েছে বারবার। যখনই আঘাত এসেছে, তখনই সংগঠিত হয়ে, সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলন ও সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ শিল্পী, লেখক, কবি, চিত্রকর, সাধু-সন্ন্যাসী, বিজ্ঞানী, গবেষক, চিন্তাবিদ, সঙ্গীতজ্ঞ, ছায়াছবি-নির্মাতাসহ বাংলার কৃষক, চাষা, জেলে, মেথর সকলে নেমে পড়েছে বাঙালির ঐতিহ্য রক্ষার লড়াইয়ে। বাঙালিদের কাছে শোভাযাত্রা ব্যাপারটি বড় প্রিয়। জন্মাষ্টমীর সময় যখন শোভাযাত্রা বের হতো, তখন ঢাকার মেয়রসহ অনেক মুসলমান সেই শোভাযাত্রায় অংশ নিতেন। আবার মহররমের সময়ে যখন শিয়া মুসলমানেরা তাজিয়া নিয়ে শোভাযাত্রায় বের হয়, তখনও অনেক সুন্নি মুসলমান তাতে অংশ নেন। আবার ‘মেলা’ বাঙালিদের আরো একটি প্রিয় বিষয়। এ অঞ্চলের জমিদার, নানা ধর্মীয় সম্প্রদায় বিভিন্ন উৎসবে মেলার আয়োজন করতো। সেসব মেলায় সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ একত্রিত হতো। মেলায় সকলের সাথে দেখা-সাক্ষাত, আলাপচারিতাই গালগপ্পপ্রিয় বাঙালির কাছে বরাবরই ছিলো মূল আকর্ষণ ।

আশির দশকে, স্বাধীনতার পরেও সাম্প্রদায়িকতার বিষদাঁত যখন বাঙালিকে আবার আক্রমণ করেছে, তখন ঢাকার চারুকলার শিল্পীবৃন্দ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে তাঁদের ভাবনায় এনেছেন বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ ‘শোভাযাত্রা’ ও ‘মেলা’। এরই ফলশ্রুতিতে, ১৯৮৯ সালে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্যোক্তারা পরিকল্পনা করলেন শোভাযাত্রা বের করার। যেখানে কোনো বিশেষ জনপদ, ধর্ম, সম্প্রদায় ও বয়সের নয়; বরং সকল মানুষের অংশগ্রহণের অধিকার থাকবে। উদ্যোক্তারা চৈত্রমাসের শুরু থেকে সারা মাসব্যাপী ‘মেলা’ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করলেন। আর এই শোভাযাত্রা ও মেলার উপাদান হিসেবে তাঁরা নির্ধারণ করলেন বাংলার লোকজ মোটিফ। এতে করে সাধারণ মানুষের চারুকলা চত্বরের মেলায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের আনন্দ, উদ্দীপনা চলতে থাকে একমাসব্যাপী।

প্রতিবছর একটি নকশা তৈরি করা হয় ও একটি শ্লোগান নির্ধারণ করা হয় পোস্টারের জন্য। সমসাময়িক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক আর সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পোস্টারের নকশা ও শ্লোগান নির্ধারণ করা হয় । মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রথম বছর থেকেই সাধারণ জনগণের বিপুল সাড়া পাওয়া গেলো। জনস্রোত আর শোভাযাত্রা ও মেলার রঙে আকৃষ্ট হয়ে দেশ বিদেশের গণমাধ্যমকর্মী আর পর্যটক ভিড় জমাতে থাকলো ঢাকার চারুকলা চত্বরে। বিশ্বময় এ উৎসবের খবর ছড়িয়ে পড়লো। আজ মঙ্গল শোভাযাত্রা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংস্কৃতির এক বাহকরূপে দণ্ডায়মান। এভাবেই, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে পৃথিবীর সকল মানুষের মঙ্গল কামনায়, সকল শ্রেণি, পেশা, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের অংশগ্রহণে মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়ে উঠলো আলো পথের যাত্রা।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesWala.Com