বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০, ০৪:৫৮ অপরাহ্ন

ধানের দাম নিয়ে কৃষক ঠকানো মানবো না

রির্পোটারের নাম / ১১৯ বার
আপডেট সময় : শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯

আবিদ হোসেন : কৃষকের স্বপ্নে বোনা সোনালী ধানের জমিন দেখে জাতীয় সংগীদের সুর ভেসে ওঠে– ‘ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে, আমি কী দেখেছি মধুর হাসি’। সারা দেশে আমন ধান কাটার মহোৎসব চলছে। এই অগ্রহায়ণের ধান দিয়েই পৌষের শীতের পিঠার আয়োজনে ব্যস্ত থাকার কথা গৃহিণীদের। এই সময়ে মহাজনী ঋণ শোধ, ছেলেমেয়েদের নতুন বছরে স্কুলে ভর্তি, শীতের পোশাক, ঘরের বেড়াসহ ইত্যাদি ইত্যাদি জমে থাকা না প্রয়োজনীয়তা ও সমস্যা সমাধান করার কথা কৃষকের। কিন্তু জাতীয় সংগীতের সেই চিরায়ত বাণী কেবল সুরেই উচ্চারিত হয়, বাস্তবে কৃষকের মুখের হাসি আজ বিষাদে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে বোরো, আমন উৎপাদন করে দেশের জনগণের অন্নের জোগান দিলেও ধান লোকসানে বিক্রি করতে করতে কৃষক আজ নিঃস্ব, দিশেহারা।

এ বছর আমন ধান উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। কিন্তু ধান বিক্রি করতে গিয়ে কৃষক দাম পাচ্ছে না। ন্যায্য দাম তো দূরে, ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচও তুলতে পারছে না প্রান্তিক কৃষক। প্রতি বছর সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের ঘোষণা দিলেও কৃষক সরকারি দামে ধান বিক্রি করতে পারে না। চাতাল মালিক, ফড়িয়া, মধ্যস্বত্বভোগী দালাল আর সরকারি দলের প্রভাবশালীরা সিন্ডিকেট গড়ে তুলে ধানের বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। গত বোরো মৌসুমে ধান বিক্রি করতে না পেরে সারা দেশে কৃষকরা বিক্ষোভ করেছে। সরকারের ধান ক্রয়ে তৎপরতা পত্রপত্রিকা আর টেলিভিশন মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করলেও প্রকৃত কৃষক ধান বিক্রি করতে পারেনি। ধান ক্রয়ের নামে চলেছে কর্মকর্তা আর সরকারদলীয় লোক-লস্করদের মিডিয়ায় ফটোসেশন। এ বছর ৬ লক্ষ মেট্রিক টন আমন ধান ক্রয়ের ঘোষণা দিয়ে ধান ক্রয় শুরু করেছে ২০ নভেম্বর থেকে। চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ পর্যন্ত। মণপ্রতি ১০৪০ টাকা দরে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করে ক্রয় করার প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। সারা দেশে ধানের বাজারে ধস নেমেছে।

গত ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯৩০ মেট্রিক টন আমন ধান সংগ্রহ করেছে সরকার। কিন্তু প্রকৃত কৃষক বিশেষ করে গরিব কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে না। পত্রিকায় শুধু খবর বেরুচ্ছে, ‘নওগাঁর বাজারে ধান-চালের দাম বেড়েছে’, ‘দাকোপে আমন ধানের দাম কমে যাওয়ায় হতাশ কৃষক’, ‘চন্দনাইশে আমন ধানের বাজার নিয়ে দিশেহারা কৃষকরা’, ‘আমন ধান নিয়ে সংকটে কৃষকরা’, ‘ময়মনসিংহে হাসি নেই কৃষকের মুখে’, ‘বেতাগীতে আমন ধানের বাম্পার ফলন দামের শঙ্কায় কৃষক’, ‘মান্দায় আমন ধানের বাজারে ধ্বস’। গত বোরো মৌসুমের মতোই আমন ধানেও কৃষক চরম লোকসান গুণবে। বিভিন্ন এলাকায় ৫০০-৬০০ টাকায় এক মণ ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। সরকারি অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালায় জটিল নিয়ম-কানুনের কারণে কৃষক সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে পারে না। নীতিমালায় কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণার কথা থাকরেও খাদ্য অফিস থেকে প্রচারণায় অনীহা। খাদ্য সংগ্রহ নীতিমালায় ধান ও গম সংগ্রহ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট করা আছে।

‘উপজেলা সংগ্রহ ও মনিটরিং কমিটি উপজেলার ধান ও গম সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা উৎপাদন অনুযায়ী ইউনিয়ন ওয়ারী বিভাজন করবে, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সরবরাহ করা মৌসুমে অবাধকৃত জমির পরিমাণ এবং সম্ভাব্য উৎপাদনের পরিমাণসহ ডাটাবেইজ হতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কৃষক নির্বাচন করবে। প্রান্তিক ও মহিলা কৃষকদের অগ্রাধিকার দিয়ে কৃষক নির্বাচন করতে হবে। উপজেলা কমিটি প্রত্যেকের প্রদেহ খাদ্যশস্যের পরিমাণসহ নির্বাচিত কৃষকদের তালিকা সংশ্লিষ্ট সংগ্রহ কেন্দ্রে প্রেরণ করবে। এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত কৃষকদের নিকট থেকে ধান ও গম ক্রয় করা হবে। ক্রয়কারী কর্মকর্তা কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড/জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত কৃষকদের সনাক্ত করবেন।

এ বছর নীতিমালার তোয়াক্কা না করে অগ্রাধিকার ভিত্তিক প্রান্তিক ও মাহিলা কৃষকদের বঞ্চিত করে ধনী, মধ্য, প্রান্তিক সকল কৃষককে একসাথে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন করে মূলতঃ সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। লাটারির আয়োজন করতে করতে গরিব কৃষক সরকারি গুদামে বিক্রির অনিশ্চয়তা দেখে ফড়িয়াদের কাছে লোকসানে আমন ধান ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। বোরো এবং আমন মৌসুমে ধান সংগ্রহের আয়োজনের মাধ্যমে সরকার দলীয় নেতাকর্মী আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হতভাগা কৃষকদের স্বপ্নের ধান ক্ষেত থেকে শত শত কোটি টাকা লুটপাটেরই মহোৎসব চলতে থাকে। কৃষির প্রতিটি ক্ষেত্র থেকেই বাজার সিন্ডিকেট তৈরি করে সংকট সৃষ্টি করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে নিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের কৃষি অর্থনীতি চূড়ান্তভাবেই ধসে পড়বে। আবহমান বাংলার চিরায়ত কৃষি অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে, কৃষি-কৃষক-দেশ বাঁচাতে কৃষকদের সংগঠিত হতে হবে। আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ধান বিক্রির ক্ষেত্রে কৃষিবান্ধব সহজ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করে ধান-গম-পাট ক্রয়ের কার্যক্রমের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রকৃত কৃষকদের তালিকা প্রতিবছর হালনাগাদ করে অগ্রাধিকার কৃষক নির্বাচন করতে হবে। হালনাগাদকৃত কৃষকদের কাছে গিয়ে সহজ পদ্ধতিতে ব্যাংকগুলোকে ১০ টাকার অ্যাকাউন্ট করার উদ্যোগ নিতে হবে।

স্থানীয় সরকার এবং কৃষি-খাদ্য বিভাগের উদ্যোগে নিয়মিতভাবে ধানের গুণগত মান রক্ষা ও ধান বিক্রি করার বিষয়ে প্রশিক্ষণ বা সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করতে হবে। ধান কাটার আগেই গ্রামে গ্রামে ব্যাপকভাবে ধান-গম ক্রয়ের নিয়ম সম্বলিত পোস্টার-লিফলেট-ব্যানার প্রচারণা করতে হবে। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে নির্দিষ্ট স্থানে একাধিক দিন গিয়ে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করতে হবে। ধানের আদ্রতা রক্ষার জন্য ব্যাপকভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র চালু করে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান-গম ক্রয় করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে খাদ্য গুদাম ও মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু সবার আগে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ কৃষক সমিতিসহ কৃষক-ক্ষেতমজুর সংগঠন এই দাবিগুলো নিয়ে ধারাবাহিক আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে আসছে। কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতি গ্রামে গ্রামে পদযাত্রা, বিক্ষোভ মিছল, সমাবেশ কর্মসূচি অব্যাহত রাখছে। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ১০৪০ টাকা মণ ধান ক্রয়, ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্রয়কেন্দ্র, খাদ্যগুদাম নির্মাণ, কৃষিকার্ড প্রদানের দাবিতে দেশব্যাপী উপজেলা পর্যায়ে আগামী ১১ ডিসেম্বর দাবি দিবস ঘোষণা করেছে। বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে উপজেলায় খাদ্য অফিস ও ইউএনও কার্যালয়ে ঘেরাও-বিক্ষোভ সমাবেশ করার আহ্বান জানিয়েছে। কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটি দাবি দিবসে ব্যাপক সংখ্যক কৃষকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রতিদিন গ্রামে-গ্রামে, হাটে-বাজারে মাইকিং প্রচারণা করার আহ্বান জানিয়েছে। দাবি দিবসে ধান নিয়ে বিক্ষোভের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করতে বাধ্য করতে হবে। সারা দেশে চলছে দুঃশাসন, লুটপাট, সন্ত্রাস। এদেশের বেরো-আমন চাষি, গম চাষি, পাট চাষি, সবজি চাষি, শ্রমিক আর ক্ষেতমজুরদের এখনই সংগঠিত হতে হবে। শক্তিশালী আন্দোলন সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। আওয়াজ তুলতে হবে– ‘দুঃশাসন’ হঠাও, ‘ব্যবস্থা’ বদলাও, ‘বিকল্প’ গড়ো। দুর্নীতি-লুটপাট-সন্ত্রাস-সাম্রাজ্যবাদ-সাম্প্রদায়িকতা রুখতে ভাত ও ভোটের দাবিতে গ্রাম-শহরের গরিব মানুষ জোট বাঁধো, লড়াই করো। লেখক : সহ-সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশ কৃষক সমিতি।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesWala.Com