শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২০, ০৪:২২ পূর্বাহ্ন

সুসঙ্গ দুর্গাপুর ও আমাদের রাশিমণি হাজং

রির্পোটারের নাম / ৫২ বার
আপডেট সময় : রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯

ডেক্স নিউজ : ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন; মহীয়সী নারী ও টংক আন্দোলনের নেত্রী রাশিমণি হাজং তার দল নিয়ে ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ লড়াইয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। স্বাধীনতার পূর্বেও ব্রিটিশবিরোধী ও অন্য আন্দোলনে আদিবাসীদের ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহ ও ১৯৩৮-১৯৪৬ সালে হাজংদের ‘টংক বিদ্রোহ’ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। টংক বিদ্রোহে আদিবাসী নেত্রী রাশিমণি হাজং যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা পৃথিবীতে বিরল।

রাশিমণির একজন প্রতিবাদী মানুষ ছিলেন। ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী, গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ‘বগাঝরা’ নামক গ্রামটি ছিল ব্রিটিশবিরোধী গ্রামগুলোর মধ্যে একটি। ব্রিটিশ মহাজন ও জোতদারদের অন্যায় নীতির বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়ান এবং হয়ে ওঠেন টংক আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী। টংক আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে কৃষক আন্দোলন। টংক মানে ধান কড়ারি খাজনা। টংক প্রথার শর্তানুসারে জমিতে ফসল হোক-বা না-হোক চুক্তি অনুযায়ী টংকের ধান জমির মালিককে দিতেই হত। ফলে কোন বছর যদি জমিতে ফসল না হয় বা খরা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে শস্য নষ্ট হয়ে যায় তবুও কৃষককে তার নির্ধারিত খাজনা পরিশোধ করতেই হত। এতে হাজংসহ অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায় এবং ওই অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকসমাজ অর্থনৈতিকভাবে দুরবস্থায় পড়ে। টংকের ধান সময় মতো পরিশোধ করতে না পারলেই কৃষকদের ওপর নেমে আসত অত্যাচার-নিপীড়ন।টংকপ্রথা কৃষকদের জন্য ছিল একটি অভিশাপ। সে জন্য তারা টংকের হাত থেকে মুক্তির জন্য সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ বা আন্দোলন গড়ে তোলেন। রাশিমণির নেতৃত্বে হাজংরা প্রথমে টংকের কুফল বিষয়ে সচেতনায়নে গ্রামে গ্রামে বৈঠক করেন। পরে ঐকমত্য সৃষ্টি হলে কৃষকরা একপর্যায়ে জমিদারদের টংক ধান দেয়া বন্ধ ঘোষণা করেন। তৎক্ষণাৎ এর ফল হিসেবে টংক চাষিদের ভাগ্যে নেমে আসে দুর্ভোগ। কেননা, জমিদারগোষ্ঠী টংক ধান আদায়ের জন্য যথাসাধ্য শক্তি প্রয়োগ করেই চলতো। মূলত হাজং কৃষকরা প্রথমে টংক প্রথা উচ্ছেদের জন্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রথমে তারা জমিদার গোষ্ঠীর সঙ্গে অতঃপর ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে এবং শেষে পাক সরকারের সঙ্গেও এ বিষয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। হাজংদের এ টংক ও জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের আন্দোলনের নেতৃত্ব দানে এগিয়ে আসেন কমরেড মণিসিংহ।

১৯৩৮ সাল থেকে টংক আন্দোলন শুরু হয় কিন্তু তার বহু পূর্ব থেকেই হাজংরা এ আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন; কারণ এখানে তাদের বাঁচা-মরা ও অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। রাশিমণি হাজংয়ের নেতৃত্বে ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে আন্দোলন যখন তুঙ্গে, দুর্গাপুরের বিরিশিরিতে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস বাহিনীর সশস্ত্র ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এসব বাহিনী বিভিন্ন গ্রামে হানা দিয়ে বিদ্রোহী হাজং কৃষকসহ অন্য কৃষকদের খুঁজতে শুরু করে। সে লক্ষ্যেই ৩১ জানুয়ারি সকাল ১০টার দিকে ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস বাহিনী বিরিশিরি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে বহেরাতলী গ্রামে তল্লাশি চালায়। কিন্তু এদিনে সে গ্রামের বিদ্রোহী কৃষক নর-নারীরা প্রতিবেশীদের টংকবিরোধী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। অবশেষে বহেরাতলী গ্রামে কাউকে না পেয়ে ক্ষিপ্ত বাহিনী লংকেশ্বর হাজংয়ের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী ও আন্দোলনকর্মী কুমুদিনী হাজংকে ধরে নিয়ে বিরিশিরি ক্যাম্পের দিকে রওনা হয়। কুমুদিনী হাজং তখন মাত্র ১৭ বছরের নারী। হাজং গ্রামগুলোতে কুমুদিনীকে ধরার সংবাদটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে রাশিমণি তার হাজং নারী-পুরুষ দল নিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর পথরোধ করেন। এ সময় বিপ্লবী রাশিমণি হাজং কুমুদিনী হাজংকে বাঁচাতে সেই সশস্ত্র বাহিনীর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েন এই বলে, ‘ময় তিমাদ, তিমাদ হুয়ে আরেগ তিমাদলা মান ময় বাঁচাব, মরিবা লাগে মুরিব।’ অর্থ: ‘আমি নারী, নারী হয়ে আরেক নারীর সম্ভ্রম রক্ষা আমিই করব, মরতে হয় মরব।’ সশস্ত্র বাহিনীও নৃশংসভাবে তাদের ওপর গুলি চালায়। ফলে এক সময় পেছন থেকে আসা গুলিতে রাশিমণি হাজং মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পেছনে পুরুষ দলের নেতা সুরেন্দ্র হাজং রাশিমণিকে ধরতে গেলে তাকেও নির্দয়ভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়।

ঐ এলাকার আদিবাসীরা পুলিশদের মেরে ঘায়েল করা শুরু করলে অবশেষে তারা কুমুদিনীকে রেখে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এভাবেই শহীদ হন আদিবাসী নেত্রী রাশিমণি হাজং। অধিকার প্রতিষ্ঠা ও একজন নারীর সম্ভ্রম রক্ষার্থে তার এ আত্মত্যাগ আজও তাকে অমর করে রেখেছে। রাশিমণি এই বিশাল বাংলায় একবারই জন্মান। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে গর্বিত শহীদ। একজন নারী হয়ে নারীর সম্ভ্রম রক্ষার্থে জীবন বিসর্জন দিয়ে রাশিমণি এখন ‘হাজংমাতা’ হিসেবে পরিচিত। ২০০৪ সালের ৩১ জানুয়ারি বহেরাতলী গ্রামের তার মৃত্যুসংলগ্ন স্থানে নির্মিত হয়েছে ‘শহীদ হাজংমাতা রাশিমণি স্মৃতিসৌধ’। প্রখ্যাত কবি রফিক আজাদ রাশিমণিকে নিয়ে তার ‘মাতা রাশিমণি’ কবিতায় লিখেছেন, ‘রাশিমণি একটি নাম, জীবন-সমান দীর্ঘ নাম। দেশবাসী, জানাও তোমরা তাকে সহস্র প্রণাম।’ রাশিমণিকে জানাই বিনম্র্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesWala.Com