শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ০৮:০৯ পূর্বাহ্ন

মৃত্যুহীন কৃষক আন্দোলন তেভাগা ৭০

রির্পোটারের নাম / ২৫৯ বার
আপডেট সময় : রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯

ডেক্স নিউজ : সত্তর বছর আগের অখণ্ড ও পরাধীন ভারতের ঔপনিবেশিক শক্তির অর্থনৈতিক ও সামাজিক দর্শনই ছিল শোষণ, অন্যায়, অবিচার। লোলুপ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দোসর হয়ে দেশীয় জোতদার-জমিদার-মহাজন নিজের দেশের গরিব অসহায় মানুষকে ক্ষুধার অন্ন থেকে বঞ্চিত করে স্পষ্ট করেছিলেন শোষকের দেশভেদ নেই, স্বদেশিয়-বিদেশিয় কোনও শ্রেণি-বিভাজন নেই। এই স্বদেশিয় জোতদার-জমিদার-মহাজনের শত-শতাব্দীব্যাপী অত্যাচার আর শোষণের পরিণতিতে ঘটে যায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, পঞ্চাশের মন্বন্তর, ‘বাপের জমি হারায় কৃষক, ‘দাপের’ জমি বেড়ে চলে জমিদারের, কৃষক পরিণত হয় ভূমিহীন বর্গাদারে। বাংলার ইতিহাস তাই কৃষকের রক্ত-ঘাম-চোখের জলে সিঞ্চিত। আবার ইতিহাসই সাক্ষী, অবমানিত, বুভুক্ষু, সর্বহারা কৃষক সমাজ মেনে নেননি এই অন্যায়, বঞ্চনা, অবিচার। প্রতিবাদ-প্রতিরোধে উজ্জ্বল অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহের উৎসার ঘটিয়েছেন। আজও প্রগতিশীল মানুষকে উদ্দীপিত করে পাকা ফসলের ‘ন্যায্য’ দাবিতে সত্তর বছর আগে সংগঠিত মহান তেভাগা আন্দোলন। সব থেকে লজ্জার কথা, স্বাধীনতা লাভের পরেও তেভাগার কৃষকদের রক্তে বাংলার মাটি ভিজে গিয়েছিল। তেভাগা আন্দোলন ছিল সেদিনের ‘দাউ দাউ বাংলা দেশের প্রাণে’র স্পর্শ সঞ্জাত। বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের কৃষকরা যে স্বাধিকার ও আত্মমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন তার নেপথ্যে ছিল তেভাগার কৃষকদের আত্মবলিদান ও রক্ত ঝরানো প্রতিজ্ঞা ও প্রতিরোধ আন্দোলন।

ঐতিহাসিক পটভূমি : ভারতের মুক্তি আন্দোলনের শেষ পর্বেও বাংলার মাটিতে ঘটেছিল এক অভূতপূর্ব কৃষক আন্দোলন যা তেভাগা সংগ্রাম নামে প্রসিদ্ধ। ১৯৪৬-৪৭ সালে তার সূত্রপাত। এর সংগঠক কৃষকসভা। ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে ব্রিটিশ সরকার যেমন রাষ্ট্রক্ষমতা প্রয়োগ করে কৃষকদের ন্যায্য দাবি, উৎপন্ন ফসলের তিনভাগর দু-ভাগ (তেভাগা), বেয়নেটের মুখে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল, সাতচল্লিশ সালের পর একইভাবে বাংলার কৃষকদের নিরন্ন রেখে তাঁদের ন্যায্য সংগ্রাম দমনের অপচেষ্টা করা হয়েছে। তেভাগার ইতিহাস সে কারণেই যেমন গৌরবদীপ্ত, তেমনই তা বাংলার কৃষকের রক্ত ও অশ্রুসিক্ত। তবে কোনও আত্মদানই ব্যর্থ হয়নি। জমিদারি প্রথা বিলোপ করে ভূমিসংস্কারকে অবশ্যকরণীয় হিসেবে গ্রহণ করতে সরকারকে বাধ্য করেছিল তেভাগা আন্দোলনই।

বাংলার কৃষক উৎপাদনের সমস্ত ব্যয় নিজেরা বহন করলেও উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক জমিদার জোতদারদের গোলায় তুলে দিতে বাধ্য ছিল। তেভাগা আন্দোলনে কৃষকদের দাবি ছিল উৎপাদনের অর্ধেক খরচ না দিলে জমিদার-জোতদার পাবে তিনভাগর এক ভাগ, কৃষকের ঘরে উঠবে দু-ভাগ ফসল। এর‍‌ই নাম তেভাগা। এর ন্যায্যতা ও বৈধতা নিয়ে কোনও প্রশ্নই উঠতে পারে না। কিন্তু জমিদাররা বন্দুক লাঠিয়াল ও পুলিশের জোরে ফসলের মাঠ কৃষকের রক্তে লাল করে দিতে সংঘবদ্ধ আক্রমণ চালায়।

বাংলার কৃষকের সমস্যার চিত্র ব্রিটিশ আমলের ফ্লাউড কমিশনের রিপোর্ট (১৯৪০) সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। দেখা যায়, বাংলার ৭৫লক্ষ কৃষিজীবী পরিবারের মধ্যে ৩০লক্ষ পরিবারের জমিতে প্রজাস্বত্বের অধিকার নেই। তারা হয় দিনমজুর, নয় ভাগচাষি। এই ভূমিহীন কৃষকরাই চাষ করে শতকরা ৩৪ভাগ আবাদি জমির। জমিদার যে কোনও সময়ে এদের কাছ থেকে জমি কেড়ে নিতে পারে। অর্থাৎ, এদের জীবিকার কোনও নিরাপত্তা নেই। ১৯৪৩-এর মন্বন্তরে সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এই ভাগচাষি। ভূমিহীন খেতমজুর শ্রেণির মানুষ। না খেতে পেয়ে এই শ্রেণির মানুষ দলে দলে মৃত্যুবরণ করেছেন রাস্তায়, ফুটপাতে। তেভাগার দাবির ন্যায্যতা ফ্লাউড কমিশন স্বীকার করেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে কৃষকদের এই ন্যায্য দাবিপূরণের আইনগত চেষ্টা কিছু হয়নি। ১৯৪৬ সালে তেভাগা আন্দোলন বাংলার নানা জেলায় শুরু হয়ে যায়। দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, কাকদ্বীপ, রংপুর, বগুড়া, জলপাইগুড়ি, যশোহর ছিল তার মধ্যে অগ্রণী।

দিনাজপুর কৃষকসভার পক্ষ থেকে স্লোগান তোলা হয় — ১। নিজ খেলানে ধান তোলো, ২। আধি নাই-তেভাগা চাই, ৩। কর্জ ধানের সুদ নাই। দিনাজপুরের কৃষক আন্দোলনের নেতা ছিলেন রাজবংশী সম্প্রদায়ের রূপনারায়ণ রায়। ১৯৪৬ সালে কমিউনিস্ট প্রার্থী হিসেবে এক বড় জোতদারকে হারিয়ে আইনসভায় নির্বাচিত হন। বাংলার ২৬টি জেলার মধ্যে ২৩টি জেলাতেই তেভাগা আন্দোলন হয়েছিল। আন্দোলনে হিন্দু ও মুসলমান গরিব কৃষকরা একসঙ্গে কাজ করেছেন। চরম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সময়েও কৃষকসভার সংগ্রামী ঐক্য অটুট ছিল।

আন্দোলনের ব্যাপকতা : ১৯৪৬ সালে খুলনা জেলার মৌ‍‌ভোগে কৃষ্ণবিনোদ রায়ের সভাপতিত্বে কৃষকসভার সম্মেলনে পাশ হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের প্রস্তাব। বস্তুত এই প্রস্তাব থেকেই বাংলার বঞ্চিত কৃষকদের তেভাগা আন্দোলনের সূত্রপাত। ‘লাঙল যার জমি তার’— এই স্লোগান কৃষকদের নবলব্ধ সংগ্রামী চেতনার পরিচয়বাহী। দিনাজপুর, রংপুর, ময়মনসিংহর গারো পাহাড় অঞ্চলে আদিবাসী কৃষকরাই আন্দোলনকে জঙ্গি করে তোলেন। তেভাগার সংগ্রাম ছিল আপসহীন, ছিল শোষণ ও বঞ্চনার অবলুপ্তি এবং খেতের ওপর কৃষকের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই।

তেভাগা আন্দোলনে মহিলাদের বিপুল সংখ্যায় অংশগ্রহণ ছিল লক্ষ্যণীয়। দিনাজপুরের সংগ্রামে রাজবংশী ও নমঃশূদ্র মহিলারা অসাধারণ সাহসী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। অনেকে শহীদ হয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত সবথেকে গৌরবজনক গণসংগ্রাম ছিল তেভাগার আন্দোলন যা সামন্তশাসিত সমাজের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁও মহকুমায় আধিয়ারদের তেভাগা আন্দোলন হয়েছিল সবথেকে তীব্র। জোতদাররা নিজের খামারে ধান তুলে নিয়ে আধিয়ার কৃষকের অর্ধাংশ থেকেও নানা অজুহাতে অনেক ধান কেটে নিত। প্রতিরোধ আন্দোলনের চাপে স্থানীয় মহকুমা শাসকের মধ্যস্থতায় দসের খেলানে ধান তোলা সাব্যস্ত হয়েছিল। সংগঠিত কৃষক আন্দোলনের মুখে পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয় বহু জায়য়ায়। গেরিলা বাহিনীর মতো দক্ষতায় ও ক্ষিপ্রতার সঙ্গে কৃষক নারী-পুরুষ পুলিশবাহিনীর পৌঁছনোর আগেই ধান কেটে কৃষকের গোলায় তুলে নিতেন। পুলিশের গুলিতে কৃষকরা শহীদ হয়েছেন। কিন্তু সংগ্রাম থামেনি, ধান তোলার বিরতি হয়নি। এই ছিল তেভাগা আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য। কৃষক মেয়েরা লাঠি দিয়ে ধান আগলেছেন। শাঁখ, কাঁসর বাজিয়ে জোতদারবাহিনীর আগমনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। অনেক অঞ্চলে ঝাঁটাবাহিনী তৈরি করে কৃষকের বুকের রক্ত দিয়ে বোনা ধান লুট করতে আসা জোতদারদের তল্পিবাহক পুলিশবাহিনীকে তাড়া করেছেন। তেভাগার আন্দোলনে যত ব্যাপকভাবে বর্গাদার কৃষকদের অংশগ্রহণ করতে দেখা গিয়েছে তার কোনও পূর্ব নজির নেই।

তেভাগার গৌরবজনক সংগ্রামে কাকদ্বীপের নাম স্মরণীয়। বুধাখালি থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত করেন গজেন মালী নামে এক কৃষকনেতা। সুন্দরবনের অনুন্নত, উপেক্ষিত দ্বীপ নিয়ে পরস্পর বিচ্ছিন্ন এই এলাকায় জোতদার ও তাদের নায়েব-গোমস্তারাই একচ্ছত্র রাজত্ব করত। তেভাগার আহ্বানে এতদিনের ঘুমন্ত জনশক্তি জেগে ওঠে। ১৯৪৬ সালে স্বাধীনতার প্রাক্‌ মুহূর্তে তেভাগা আন্দোলন শুরু হলেও ১৯৫০ সাল পর্যন্ত এর প্রতিরোধ ছিল অব্যাহত। অবিভক্ত চব্বিশ পরগনার হাসনাবাদ, সন্দেশখালি, হুগলির বড়া কমলাপুর, ডুবেরভেড়ি প্রভৃতি নাম সংগ্রামের তীব্রতায় স্মরণীয় হয়ে আছে। সুন্দরবনের কৃষক আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য এই যে এই আন্দোলন এক বছরে গোটা এলাকাকে প্রায় মুক্তাঞ্চলে পরিণত করতে পেরেছিল। জোতদারের লাঠিয়াল যায়নি ফসলের ভাগ নিতে। অজস্র মামলার ফাঁসে জড়ানো কৃষক ও কৃষক নেতাদের কাছে পৌঁছতে পারেনি পুলিশ। হেমন্ত ঘোষাল, কংসারী হালদার, অশোক বসু প্রমুখ নেতারা দীর্ঘদিন আত্মগোপন করে থেকে কৃষক আন্দোলন পরিচালনা করে তাঁদের ন্যায্য দাবি আদায়ে সহায়তা করেছেন।

তেভাগা সংগ্রামের চাপে পড়ে অবিভক্ত বাংলার লিগ মন্ত্রিসভা বর্গাদার বিল আইনসভায় পেশ করতে বাধ্য হয়। ১৯৪৬ সালের ১২ই মার্চ আইনসভায় বিরোধীদলের কমিউনিস্ট সদস্য জ্যোতি বসু সরকারি দমননীতির নিন্দা করে বলেছিলেন, ‘‘কৃষিজমির বর্গাদারকে তাঁর উৎপাদিত ধানের দুই-তৃতীয়াংশ ভাগ দেওয়ার আইনসিদ্ধ অধিকার সরকার কর্তৃক পরিত্যাগ করার স্বেচ্ছাপ্রণোদিত এবং বিশ্বাসঘাতক নীতির তীব্র নিন্দা করছি আমি।’’ তখন মুখ্যমন্ত্রী (অবিভক্ত বাংলায় বলা হত প্রধানমন্ত্রী) ছিলেন মুসলিম লিগের এইচ এস সোহরাবর্দি। হিন্দু ও মুসলমান জোতদার-জমিদারদের চাপে খসড়া বর্গাদার বিল তিনি আর কার্যকর করেননি। তখন দেশ বিভাজন হওয়ার কালো ছায়া ঘনায়মান। কিছুদিনের মধ্যেই জ্বলে উঠেছিল দাঙ্গার দাবাগ্নি। দুই বাংলাতেই হিন্দু ও মুসলমান কৃষকদের সম্মিলিত তেভাগা আন্দোলন রক্তস্নাত করে ধানের খেতে সোনালি শিষের শরীর নিয়ে জেগে ওঠে। দক্ষিণে সুন্দরবন আর উত্তরে তরাই নিয়ে গঠিত বাংলার অন্যতম বৈপ্লবিক ও গৌরবজনক তেভাগার সংগ্রামের রূপকার বাংলার চিরবঞ্চিত হিন্দু ও মুসলমান কৃষক। আজও কংসারী হালদার বা অহল্যা মা বাংলার ইতিহাসের নায়ক-নায়িকা। যদিও তেভাগার দাবির সত্যিকারের রূপ দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকারের শাসনভার গ্রহণ পর্যন্ত। এই তেভাগারই প্রত্যক্ষ ফল ভূমি সংস্কারের আন্দোলন, অপারেশন বর্গা। তেভাগার প্রভাব শুধু ভূমি সংস্কারের আন্দোলনেই পড়েনি সাহিত্য-সংগীত-নাটক-চলচ্চিত্রসহ সৃজন, চিন্তায়-মননে ফেলেছিল এক নিবিড় প্রভাব।

তেভাগার লড়াই এবং সাহিত্য-সংগীত : ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে খুলনা জেলার মৌভোগে অনুষ্ঠিত কৃষক সম্মেলনের প্রেরণায় কবি বিষ্ণু দে রচনা করলেন কবিতা — ‘মৌভোগ’। কবি লিখলেন, ‘জন্মে তাদের কৃষাণ শুনি কাস্তে বানায় ইস্পাতে/কৃষাণের বউ পঁইছে বাজু বানায়/ যাত্রা তাদের কঠিন পথে রাসীবাঁধা কিশোর হাতে—/ রাক্ষসেরা বৃথাই রে নখ শানায়।’ কবিতা‍‌টি যখন ‘অরণি’ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন অবশ্য তেভাগার লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর গণঅভ্যুত্থানের শ্রেষ্ঠ গীতিকার সুরকার সলিল চৌধুরির গানে বলিষ্ঠ ভাষা পায় সংগ্রামী কৃষকদের দাবি — ‘হেই সামালো! হেই সামালো!/ হেই সামালো ধান হো/কাস্তেটা দাও শান হো/জান কবুল আর মান কবুল/আর দেব না, আর দেব না/ রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো।।’ তেভাগার আন্দোলন নিয়ে সলিল চৌধুরির সবথেকে উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি ‘কাকদ্বীপ’ শীর্ষক কবিতা। উত্তর-স্বাধীনতা পর্বের সুবিখ্যাত তেভাগা অঞ্চল সুন্দরবনের কাকদ্বীপ। ১৯৪৮ সালের অক্টোবর মাসে এখানকার চন্দনপিঁড়ি গ্রামের কৃষক বধূ অহল্যা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হন। তিনি তখন ছিলেন অন্তঃস্বত্ত্বা। সলিল লিখলেন, ‘সেদিন রাত্রে সারা কাকদ্বীপে/হরতাল হয়েছিল/সেদিন আকাশে জলভরা মেঘ/বৃষ্টির বেদনাকে/বুকে চেপে ধরে থমকে দাঁড়িয়েছিল।/এই পৃথিবীর আলো-বাতাসের অধিকার পেয়ে/পায়নি যে শিশু জন্মের ছাড়পত্র/তারি দাবি নিয়ে সারা কাকদ্বীপে/কোন গাছে কোন কুঁড়িরা ফোটেনি/ কোনো অঙ্কুর মাথাও তোলেনি/ প্রজাপতি যত আরো একদিন/গু‍‌টিপোকা হয়েছিল/সেদিন রাত্রে সারা কাকদ্বীপে/হরতাল হয়েছিল’।

চন্দনপিঁড়ির ‘অহল্যা মা’ অমর হয়ে আছেন একাধিক গানে। যেমন প্রখ্যাত গণসংগীতকার বিনয় রায়ের ‘আর কতকাল, বল কতকাল, সইব এ মৃত্যু আসান’ গানটি। তেভাগার শহিদরা অনুপ্রেরণা দিয়েছেন গণগীতিকার হেমাঙ্গ বিশ্বাসকেও। শিলচর জেলে বন্দি কৃষক মাধবীনাথের মৃত্যুতে (১৯৫০) ভাটিয়ালির একটি বিশেষ ঢঙে তাঁর গান — ‘আমরা তো ভুলি নাই শহীদ একথা ভুলবো না/তোমার কলিজার খুনে রাঙাইলো কে আন্ধার জেলখানা।’ ১৯৫৩ সালের মে মাসে হাওড়ার বাগনানে অনুষ্ঠিত হয় কিষানসভার প্রকাশ্য প্রাদেশিক সম্মেলন। এই অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলনের ঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা ছিল তরুণ কবি পূর্ণেন্দু পত্রীর। সৃষ্টি হলো কবিতা ‘বাগনান’। কবি লিখলেন, ‘জন্মদুঃখী কৃষকের দুটি হাতে দোতারার তার/ঢেউ তোলে অস্থির কান্নায়/পঞ্জরাস্থি ছিঁড়ে ফেলে/কবিয়াল গায় কবিগান।/দুর্জয় বক্তৃতা শোনে/আবালবনিতাবৃদ্ধ/মধ্যবিত্ত মজুর কিষান।’ অমর হয়ে রয়েছে সুকান্ত ভট্টাচার্য বিরচিত ‘দুর্মর’ কবিতাটি। সুকান্ত লিখলেন, ‘এবার লোকের ঘরে ঘরে যাবে/সোনালি নয়কো, রক্তে রঙিন ধান,/দেখবে সকলে সেখানে জ্বলছে/ দাউ দাউ করে বাংলা দেশের প্রাণ। কবি রাম বসু লিখলেন, ‘দ্বীপান্তরেই যদি চলে যায় গজেন মালী/বাঁচব কি করে? মন হবে শুধু চরের বা‍‌লি’। তেভাগার সংগ্রাম জন্ম দিলো অনিল ঘোষের ‘নয়ানপুর’ নাটকের। ১৯৪৮ সালের গোড়ায় ডোঙাজোড়া গ্রামে পু‍‌লিশ-কৃষক সংঘর্ষের ঘটনার ভিত্তিতে নাটকটি রচিত হয়। ১৯৪৯-৫০ সালে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ তেভাগা অঞ্চল জুড়ে নাটকটি বহুবার অভিনীত হয়েছে।

১৯৪৮-এ বড়া কমলাপুরে কৃষক-পুলিশ যুদ্ধের পটভূমিকায় লেখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’ বাংলা সাহিত্যে সুপরিচিত। ১৯৫০-এর দশকেই রচিত হয় সাবিত্রী রায়ের উপন্যাস ‘পাকা ধানের গান।’ এই উপন্যাসের পটভূমি ছিল ময়মনসিংহের হাজং কৃষকদের আন্দোলন নিয়ে, সে আন্দোলন ছিল তেভাগারই অংশ। ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’তে উঠে আসে তেভাগার জন্য কৃষক মানসে নবজাগ্রত চেতনা। গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, ‘মোরা কলির পাপী লোক, এ লড়াইয়ে মোরা মরব। মোদের ছেলেপুলেরা ফের সত্যযুগ করবে।’ ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলন ‘ছোট বড়’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ছোটগল্প ‘হারানের নাতজামাই।’ এই গল্পের প্রথম দিকে গল্পকার লিখেছেন,‘শীতের ত-ভাগা চাঁদের আবছা আলোয় চোখ জ্বলে ওঠে চাষীদের….।’ অবমানিত অথচ সংগ্রামী কৃষক সমাজকে উপজীব্য করে তেভাগা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট, ঘটনা পরম্পরা, উত্তাপ, প্রতিবাদী মানসিকতা, কৃষকদের আন্তরিকতা ও ঋজু মনোভঙ্গি ‘হারানের নাতজামাই’ ছোটগল্পটিকে উজ্জ্বল করে তুলেছে। শিশির দাস তেভাগা আন্দোলনের ছত্রিশ বছর পরে কাকদ্বীপের লালগঙ্গ গ্রামের পটভূমিকায় লিখেছিলেন উপন্যাস ‘শৃঙ্খলিত মৃত্তিকা’।

১৯৪৭-এর ১৫ই আগস্ট ‘স্বাধীনতা পত্রিকায় যশোরের নমঃশূদ্র কৃষক পঞ্চানন দাসের এক দীর্ঘ গান প্রকাশিত হয় — ‘হও রে সবে আগুয়ান।’ জনপ্রিয় হয়েছিল রংপুর অঞ্চলের প্রচলিত লোকগীতি ‘ভোটানযাত্রা।’ ‘বনুসের (বউয়ের) হাত ধরি ভোটানত যায়।/ কান্তাই (কড়াই) মাথায় দিয়া ফিরে ফিরে চায়।’ রংপুর-এর কৃষক ও কিষানসভার সদস্য জামশেদ আলি চাটি তেভাগার সময় গ্রামে-গ্রামান্তরে ঘুরে গান গেয়ে কৃষকদের সংগ্রামে উদ্ধুদ্ধ করতেন। গয়াবাড়ির বিপিন বর্মণ ও গাভরণের রাজেন্দ্র সাধুও ছিলেন তেভাগা আন্দোলনের কৃষক গায়ক। জলপাইগুড়ির তেভাগা আন্দোলনে কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন চা বাগানের শ্রমিকরাও। সাদ্রী ভাষায় গান বেঁধেছিলেন শ্রমিক লাল শুকরা ওঁরাও। ‘মালবাজার আনা যানা/মাটিয়ালী থনা রে/শুনো ভাই-স্বাধীন দেশকা গানা রে।/এক বিতা পেট লিগিন/গিলি জেলখানারে/শুনো ভাই — স্বাধীন দেশকা গানা রে।’ সকালে কৃষকরা যখন মাঠে ধান কাটতে যেতেন তখন তাঁদের মুখে মুখে ফিরত গণগীতিকার বিনয় রায়ের গান — ‘চাষী দে তোর লাল সেলাম লাল ‍‌ নিশানরে।’

তেভাগার আন্দোলনে অনেক মধ্যবিত্ত মানুষ শারীরিকভাবেই অংশ নিয়েছিলেন। ন্যায়ের আদর্শ ও আসন্ন অভিষ্ট লাভের স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন কৃষকরাও। দৈনন্দিন জীবনের ওঠা-বসা, কাজকর্ম ও বেঁচে থাকায় তেভাগা মধ্যবিত্ত ও কৃষক অংশগ্রহণকারীদের অনেক কাছাকাছি এনে দিয়েছিল। পারস্পরিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সুযোগ করে দিয়েছিল। আদতে এই বিনিময়ের ভিত্তি ছিল পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্য। এর উজ্জ্বল বিবরণ বিবৃত রয়েছে সোমনাথ হোরের ‘তেভাগার ডায়েরি’তে। তেভাগার সংগ্রাম ও চলচ্চিত্র : ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম প্রকাশ্য সম্মেলন হলো ১৯৪৩-এর ১লা জুন আর ভারতীয় গণনাট্য সংঘর প্রথম সম্মেলন হলো সেই বছরেই কয়েকদিন আগে ২৫শে মে। পাশাপাশি ১৯৩৬-এর কৃষকসভার আধিয়ারের দাবির আন্দোলন চলেছে বাংলার গ্রামে গ্রামে। গণনাট্যের কর্মীরা গল্পে-উপন্যাসে-নাটকে বাংলার কৃষক আন্দোলনকে শহর কলকাতার মানুষের সামনে তুলে ধরলেন। শহরের তরুণরা তখন আকুল আগ্রহে প্রত্যক্ষ করছেন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সোভিয়েত জনসাধারণের মরণপণ লড়াই। এই সময়ই শুরু হয় তেভাগার আন্দোলন। চিত্রনাট্যে উঠে এল বাংলার কৃষক আর ভাগ্যের দোষ দিচ্ছেন না। কৃষক রমণী শুধু সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালিয়ে শঙ্খধ্বনি করেই ক্ষান্ত নন, ধানের গোলা রক্ষা করার জন্য কাস্তে নিয়ে পুলিশ আর জমিদারের গুন্ডাবাহিনির মু‍‌খোমুখি রুখে দাঁড়িয়েছেন।

ছবি প্রযোজনার সুযোগ এসে গেল গণনাট্য সংঘের কর্মীদের হাতে। এ বিষয়ে বোম্বাই (এখন মুম্বাই) গণনাট্য সংঘের- কর্মীরা এগিয়ে ছিলেন। এগিয়ে এলেন বলরাজ সাহনিরা। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘ধরতি কে লাল’-এর প্রযোজনা এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সেই প্রথম কমিউনিস্ট পার্টির একটি গণসংগঠন সরাসরি চলচ্চিত্র প্রযোজনার মতো ব্যয়বহুল বিপুল কর্মকাণ্ডে নিজেদের যুক্ত করে। প্রযোজনায় ছিলেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘর পক্ষে ডি পি সাঠে, পরিচালনায় গণনাট্যের এবং ভারতীয় চলচ্চি‍‌ত্রের প্রবাদপুরুষ খোয়াজা আহমদ আব্বাস। সংগীত পরিচালনায় রবিশঙ্কর, গীতিকার প্রেম ধাওয়ান। অভিনয়ে বলরাজ সাহনি, দময়ন্তী সাহনি, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি ভাদুড়ি (মিত্র), উষা দত্ত প্রমুখ। বোম্বাইয়ে প্রযোজিত হলেও কাহিনিসূত্র এই বাংলার। কৃষকের ওপর জমিদারের শোষণ, নির্যাতন, ভাগ্য ফেরানোর আশায় শহর কলকাতায় আসা, সেখানেও প্রবঞ্চনা। এবার প্রতিরোধ। কৃষক হাতে কাস্তে তুলে নিচ্ছেন ধানের গোল রক্ষা করার লড়াইয়ে। কৃষকের প্রতিবাদী মূর্তি, কৃষক রমণীর শিরদাঁড়া টান করে রুখে দাঁড়ানোর ছবি এই প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রবেশ করল। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৪৬-এর শেষাশেষি যখন কেরালার কাঁয়ুর, অন্ধ্রের তেলেঙ্গানা আর বাংলার গ্রামের পর গ্রাম তেভাগা আন্দোলন ও সংগ্রামের ঢেউয়ে উত্তাল।

‘ধরতি কে লাল’-এর অসামান্য সাফল্যে উদ্দীপিত হয়ে ১৯৪৬ সালে চেতন আনন্দ ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (আই পি টি এ)-র ব্যানারেই তৈরি করলেন ‘নিচা নগর’। ম্যাক্সিম গোর্কির ‘লোয়ার ডেপথ্‌স’-কে সামনে রেখে গরিব মানুষের প্রতিবাদী চেহারা চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু হয়ে দর্শকগ্রাহ্যও হলো। এবার মূলধারার ১৯৪৭ সালে বিজয় ভাট নির্মাণ করলেন ‘সমাজ কো বদল ডালো’। অভিনয়ে ছিলেন গণনাট্য কর্মী প্রেম ধাওয়ান, লীলা পাওয়ার প্রমুখ।

কৃষক জীবনের শোষণের জমিদারি নির্যাতনের কাহিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে ১৯৫৩ সালে নির্মিত পরিচালক বিমল রায়ের ‘দো বিঘা জমিন’। এ ছবির নৈপুণ্য, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সুবিদিত। কৃষকের জমি হারানোর বঞ্চনার মর্মন্তুদ দলিল এই ছবি বোম্বাইয়ে নির্মিত হলেও এ ছবির কাহিনিকার গণনাট্যের উজ্জ্বল ফসল সলিল চৌধুরির। সংগীতও তাঁর। বাংলার কৃষক আন্দোলন, কৃষকের অবস্থান চিত্রিত হয়েছে এই ছবিতে। বলরাজ সাহনি, নিরূপা রায়ের অভিনয় এ ছবির ঐশ্বর্য। একই কাহিনি নিয়ে সত্যেন বসু ১৯৫৪ সালে ছবি করলেন কলকাতায়। নাম ‘রিক্‌সা অলা’। নায়কের ভূমিকায় ছিলেন আর এক গণনাট্যের কর্মী কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। আটের দশকে পরিচালক পূর্ণেন্দু পত্রী ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’ নিয়ে ছবি তৈরি করেন। সলিল চৌধুরিকে বহুদিন পরে গণনাট্যের জলহাওয়ায় ব্যবহার করেন প্রণব চৌধুরি। তৈরি করেন ‘হারানের নাতজামাই’।

তেভাগার কৃষক আন্দোলন বাংলা তথা দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চেতনায় এক স্থায়ী আসন দখল করে নিয়েছে। তেভাগার লড়াইয়ের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ফসল যেমন ভূমিসংস্কার আইন, অপারেশন বর্গা তেমনই বাংলা তথা দেশের সাংস্কৃতিক জীবনে ও সামন্ততান্ত্রিক পশ্চাদপদ ধ্যান-ধারণার জোয়াল ভাঙার শিক্ষা বয়ে এনেছিল আজ থেকে সত্তর বছর আগে সংগঠিত ও সংঘটিত তেভাগার কিংবদন্তিসম সংগ্রাম।


এ জাতীয় আরো খবর
Developed By ThemesDealer.Com