শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২০, ০৪:৫৪ পূর্বাহ্ন

অধিকার আদায়ের প্রথম সফল সংগ্রাম, নানকার কৃষক বিদ্রোহ

রির্পোটারের নাম / ১৪৪ বার
আপডেট সময় : রবিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৯

ডেক্স নিউজ : ১৮ আগস্ট ১৯৪৯ সাল, মানব সভ্যতার ইতিহাসে জন্ম নিয়েছিল একটি নির্মম ইতিহাস। ১৯৩৭ সালের ঘৃন্য নানকার প্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে ঐ দিন ঝরে পড়ে ৬টি তাজাপ্রাণ। ব্রজনাথ দাস (৫০) কটুমনি দাস (৪৭) প্রসন্ন কুমার দাস (৫০) পবিত্র কুমার দাস (৪৫) অমূল্য কুমার দাস (১৭) ও রজনী দাস নামের ছয়জন কৃষক তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে পূর্বসূরীদের ঋণ শোধ করেন। রক্তাক্ত পরিসমাপ্তি ঘটে নানকার আন্দোলনের।

তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ সালে তৎকালিন সরকার জমিদারী প্রথা বাতিল ও নানকার প্রথা রদ করে কৃষকদের জমির মালিকানার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাসে বিশেষ করে অধিকারহীন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে সকল গৌরবমন্ডিত আন্দোলন বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল তার মধ্যে নানকার বিদ্রোহ অন্যতম। নানকার বিদ্রোহ ছিল পাকিস্থান আমলে অধিকার আদায়ের প্রথম সফল সংগ্রাম।

নানকার প্রথা:- উর্দূ বা ফার্সি শব্দ ‘নান’ এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘রুটি’। তাই রুটির বিনিময়ে যারা কাজ করতেন তাদেরকে বলা হত নানকার। বৃটিশ আমলে সান্তবাদী ব্যবস্থার সবচেয়ে নিকৃষ্টতম শোষণ পদ্ধতি ছিল এই নানকার প্রথা। ১৯৩৭ সালে বৃটিশ সরকার এই প্রথা চালু করে। নানকার প্রজারা জমিদারের দেওয়া বাড়ি ও সামান্য কৃষি জমি ভোগ করতো। কিন্তু ঐ জমি বা বাড়ির তাদের মালিকানা ছিল না। তারা বিনা মজুরিতে জমিদার বাড়িতে বেগার খাটত । তাদের এই বেগার খাটাকে তখন ‘হদ-বেগারি’ বলা হতো। চুন থেকে পান খসলেই তাদের উপর চলতো অমাুষিক নির্যাতন। নানকার প্রজার জীবন ও শ্রমের উপর ছিল জমিদারের সীমাহীন অধিকার।

‘নানকার প্রথা অনুযায়ী মালিক জমিদার, জমি বাড়ি কিছুতে নাই প্রজার অধিকার।
জমিদারের কতা শোনাই নানকার প্রজার কাজ, মানতে হবে সকল কথা চলবেনা আওয়াজ।
কৃষি জমির সাথে ছিল একখানা বাড়ি, বিনিময়ে করতে হতো জমিদারের হদ-বেগারি।’

নানকার আন্দোলন:- নানকার আন্দোলনের সংগঠক কমরেড অজয় ভট্টাচার্যের দেওয়া তথ্য মতে, সে সময় বৃহত্তর সিলেটের ৩০ লাখ জনসংখ্যার ১০ ভাগ ছিল নানকার এবং নানকার প্রথা মূলত: বাংলাদেশের উত্তর থেকে পূর্বাঞ্চলে অর্থাৎ বৃহত্তর সিলেটে চালু ছিল। ১৯২২ সাল থেকে ১৯৪৯ সাথে পর্যন্ত কমিউনিষ্ট পার্টি ও কৃষক সমিতির সহযোগিতায় বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, বড়লেখা কুলাউড়া, বালাগঞ্জ, ধর্মপাশা থানায় নানকার আন্দোলন গড়ে ওঠে।

বিয়ানীবাজারে নানকার বিদ্রোহ: ঐতিহাসিক নানকার বিদ্রোহের সূতিকাগার ছিল বিয়ানীবাজার থানা। সামন্তবাদী শোষণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিয়ানীবাজার অঞ্চলের নানকার ও কৃষকরা সর্বপ্রথম বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। লাউতা বাহাদুরপুর অঞ্চলের জমিদাররা ছিল অতিমাত্রায় অত্যাচারী। তাদের অত্যাচারে নানকার, কৃষক সবাই ছিল অতিষ্ঠ। লোক মুখে শোনা যায়, বাহাদুরপূর জমিদার বাড়ির সামনের রাস্থায় সেন্ডেল বা জুতা পায়ে হাঁটা যেত না। ছাতা টাঙ্গিয়ে চলা ও ঘোড়ায় চড়াও ছিল অপরাধমূলক কাজ। কেউ এর ব্যতিক্রম করলে তবে তাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো। জমিদারদের এহেন অত্যাচারে অতিষ্ঠ হলেও তার শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার সাহস কারোরই ছিল না। শোনা যায় নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করেও কেউ জমিদারদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পেত না।

‘ইচ্ছা মতন খাটায় প্রজায় চুন খসিলে মারে, ঘরের বউরে ধইরা আইনা ইজ্জত নষ্ট করে।
নানকার কৃষকদের ছিলনা মান সম্মান, ছিলোনাকো কোথাও আশ্রয় কিংবা বিচারেরর স্থান।
তাই জমিদারের বিচারই ছিল চুড়ান্ত, মুখ বুজে নানকার কৃষক সেই বিচারই মানত।
শাস্তি ছিল কিল চড় লাথি, ঝুলাইয়া বেত মারা, অপরাধ করিলে বেশি শাস্তি তকতা উড়া।’

ঐক্যবদ্ধ নানকার কৃষক:- দিনে দিনে জমিদারদের অত্যাচার বাড়তে থাকে সেই সাথে বাড়তে থাকে মানুষের মনের ক্ষোভ। এই অনাচারের প্রতিকার চায় সবাই। তাই গোপনে গোপনে চলে শলা পরামর্শ। কেউ কেউ আবার সাহস সঞ্চার করে এ সময় নানকার ও কৃষকদের সংগঠিত করে কৃষক সমিতি ও কমিউনিষ্ট পার্টি সক্রিয় করেন। অজয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে চলতে থাকে নানকার কৃষকসহ সকল নির্যাতিত জনগনকে সংগঠিত করার কাজ।

নানকার আন্দোলনের সংগঠক: নিপীড়িত মানুষকে সংগঠিত করতে সে সময় অজয় ভট্টাচার্যের সাথে কাজ করেছেন নইমউল্লাহ, নজিব আলী, জোয়াদ উল্ল্যা, আব্দুস সোবহান পটল, আকবর আলী, শিশির ভট্টাচার্য, ললিত পাল, শৈলেন্দ্র ভট্টাচার্য, অপর্ণা পাল, সুষমা দে, অসিতা পাল ও সুরথ পালসহ আরও কয়েকজন। তাদের নেতৃত্বে নানকার কৃষক ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রকাশ্য বিদ্রোহ করে জমিদারের বিরুদ্ধে।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হলে পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক সরকার জমিদারদের পক্ষ নিয়ে নানকার আন্দোলন দমন করার ঘোষণা দেয়। গ্রামে গ্রামে পুলিশ ঘাটি স্থাপন করে চালায় নির্যাতন। এতে নানকার আন্দোলন থেমে না গিয়ে আরও ব্যাপকভাবে য় বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় জমিদারের লাঠিয়ালদের নির্যাতনে নিহত হোন সুনাই নদীর খেয়া মাঝি রজনী দাস।

‘এই অবস্থায় ভারতবর্ষ ভাগ হইয়া গেল, সিলেট জেলা পাকিস্তানের অধিনে পড়িল।
এই সুযোগে জমিদারগণ সরকারকে বুঝায়, নানকার আন্দোলন হিন্দুদের কাজ ভারত তারা চায়।
এই কথা শুনিয়া পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক সরকার, নির্দেশ দেয় নানকার বিদ্রোহ দমন করিবার

প্রকাশ্য বিদ্রোহ: শুরু হয় জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রাহ, বন্ধ হয়ে যায় খাজনা দেয়া- এমনকি জমিদারদের হাট-বাজারের কেনাকাটা পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হয়। জমিদার বাড়িতে কর্মরত সকল দাসি-বাদিসহ সবাই কাজ থেকে বেরিয়ে আসেন। বিভিন্ন জায়গায় জমিদার ও তার লোকজনকে ধাওয়া করে তাড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটে। এতে ভীত সন্ত্রস্থ জমিদাররা পাকিস্তান সরকারের শরণাপন্ন হয়ে এ অঞ্চলের নানকার কৃষকদেরকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন করে। জমিদারদের প্ররোচনায় পাকিস্তান সরকার বিদ্রোহ দমনের সিদ্ধান্ত নেয়।

‘ সরকারের সিদ্ধান্তে হতাশ হয় নানকার কৃষক, তবে আন্দোলন দমে না, হয় আর ব্যাপক।
বিদ্রোহ দমন করতে পাকিস্তান সরকার, অজয় ভট্টাচার্য সহ অনেক নেতাকে করে গ্রেফতার।’

সানেশ্বরে পুলিশের গুলি:- ১৭ আগস্ট ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শ্রাবণী সংক্রান্তি। প্রথম দিনের উৎসব আরাধনা শেষে আগামী দিন মনসা পূজার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে গভীর রাতে বিছানার গা এলিয়েছেন সানেশ্বর উলুউরির মানুষ। ভোরে উঠে পূজা অর্চনা, আনন্দ উৎসব আরও কত কি ভাবতে ভাবতে গভীর ঘুমে ঢলে পড়েন সবাই। কিন্তু ১৮ আগস্ট ভোরের সূর্য ওঠার সাথে সাথে পাকিস্তান সরকারের ইপিআর ও জমিদারের পেটোয়া বাহিনী আক্রমণ করে সানেশ্বরে। ঘুমন্ত মানুষ শুকুনের আচমকা ঝাপটায় ঘুম ভেঙ্গে দিগবিদিক পালাতে থাকে। সানেশ্বর গ্রামের লোকজন পালিয়ে পার্শ্ববর্তী উলুউরিতে আশ্রয় নেয়। উলুউরি গ্রামে পূর্ব থেকেই অবস্থান করছিলেন নানকার আন্দোলনের নেত্রী অপর্ণা পাল, সুষমা দে, অসিতা পাল ও সুরথ পাল। তাদের নেতৃত্বে উলুউরিও সানেশ্বর গ্রামের কৃষক নারী পুরুষ সুরকারী বাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়াবার প্রস্তুতি নেয় এবং লাঠি, হুজা, ঝাটা ইত্যাতি নিয়ে মরণ ভয় তুচ্ছ করে সানেশ্বর ও উলুউরি গ্র্রামের মধ্যবর্ত্তী সুনাই নদীর তীরে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয় সরকারি ও জমিদার বাহিনীর সাথে। কিন্তু ইপিআরের আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে লাঠিসোটা নিয়ে বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি কৃষকরা। ঘটনা স্থলেই ঝরে পড়ে ৫ টি তাজা প্রাণ। আহত হোন হৃদয় রঞ্জন দাস, দীননাথ দাস, অদ্বৈত চরণ দাসসহ অনেকে। বন্দি হোন এই আন্দোলনের নেত্রী অপর্ণা পাল, সুষমা দে, অসিতা পাল ও উলুউরি গ্রামের প্রকাশ চন্দ্র দাস হিরণ, বালা দাস, প্রিয়মণি দাস, প্রহাদ চন্দ্র দাস ও মনা চন্দ্র দাস। বন্দিদের উপর চালানো হয় অমানসিক নির্যাতন, নির্যাতনে আন্দোলনের নেত্রী অন্তসত্তা অপর্ণা পালের গর্ভপাত ঘটে। পালিয়ে যাওয়া বিদ্রোহীদের ধরার জন্য পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয় সানেশ্বর ও উলুউরি প্রামে। এ ঘটনর পর আন্দোলন উত্তাল হয় সারাদেশে।

অবশেষে ১৯৫০ সালে প্রবল আন্দোলনের মুখে সরকার জমিদারি প্রথা বাতিল ও নানকার প্রথা রদ করে কৃষকদের জমির মালিকানা দিতে বাধ্য হয় সরকার। গৌরবমন্ডিত এই নানকার বিদ্রেহের শহীদস্মরণে ধীর্ঘ দিন কোন স্মৃতি সৌধ নির্মাণ হয় নি। অবশেষে বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কমান্ডের উদ্যোগে ২০০৯ সালে বিয়ানীবাজার উপজেলার সানেশ্বর ও উলুউরী গ্রামের মধ্যবর্তী যে স্থানে নানকার কৃষক বিদেদ্রাহ সংঘটিত হয়েছিল নেই সুনাই নদীর তীরে নানকার বিদ্রোহের শহীদ স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। ২০ আগস্ট ২০০৯ তারিখে স্মৃতিসৌধের উদ্ভোধন করেন বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তার পর থেকে প্রতি বছর ১৮ আগস্ট স্মৃতিসৌধে পুস্পার্ঘ অর্পন করে নানকার কৃষক বিদ্রোহের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান বিয়ানীবাজারের মানুষ।

নানকার প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে কৃষক তাদের অধিকার ফিরে পেয়েছে ১৯৫০ সালে, কিন্তু এখনোকি মানুষ নির্বিঘ্নে তাদের অধিকার ভোগ করতে পারছে? এখনও কি মধ্যযুগের দাস প্রথা আর বৃটিশ আমলের নানকার প্রথার সাথে মিলে যায় না আমাদের বর্তমান সমাজ চিত্র? ভেবে দেখবেন আপনারা।

লেখক- নাট্যকর্মী ও সাংবাদিক/ সভাপতি বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কমান্ড।

                    — ০ —


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesWala.Com