রবিবার, ০৯ মে ২০২১, ০৩:৪২ অপরাহ্ন

ইতিহাসের সাক্ষী কুমুদিনী হাজং

রির্পোটারের নাম / ১১৭ বার
আপডেট সময় : রবিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৯

আলতাব হোসেন : সময়টা ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি। রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুর। ব্রিটিশ পুলিশ দল টংক আন্দোলনকারীদের খোঁজ করার নামে ঘরে ঘরে তল্লাশি চালায় বহেরাতলী গ্রামে। এ গ্রামের টংক আন্দোলনের আদিবাসী নেতা লংকেশ্বর হাজংকে না পেয়ে ঘরে থাকা তার নববিবাহিত রূপসী স্ত্রী কুমুদিনী হাজংয়ের সঙ্গে পুলিশ দল অশালীন আচরণ শুরু করে। এক পর্যায়ে তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকে দুর্গাপুর সদর পুলিশ ক্যাম্পের দিকে। নারী নির্যাতনবিরোধী প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে এখনও বেঁচে আছেন কুমুদিনী হাজং। তার বয়স এখন প্রায় ৮৭ বছর। আজ থেকে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে শুরু হচ্ছে সপ্তাহব্যাপী রাশিমণি হাজং মেলা।

১৯৪৬ সালের সেই দিন। কুমুদিনীকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে_ এ খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের গ্রামগুলো থেকে প্রতিবাদী আদিবাসীরা তীর-ধনুক, ঝাঁড়ূ, দা, লাঠি ও বল্লম হাতে নিয়ে এগিয়ে আসে। তৎকালীন টংক আন্দোলনের নারীনেত্রী রাশিমণি হাজংয়ের নেতৃত্বে শতাধিক নারী-পুরুষ সোমেশ্বরী নদীতীরে এসে পুলিশের পথরোধ করে দাঁড়ায়। প্রতিবাদী আদিবাসীরা পুলিশ দলকে নারী নির্যাতন করায় ভর্ৎসনা করে। পুলিশ দল আদিবাসীদের কথায় কর্ণপাত না করে কুমুদিনীকে টেনেহিঁচড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে নারীনেত্রী রাশিমণি পুলিশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তার হাতের দা দিয়ে পুলিশদের এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। পুলিশ প্রথমে প্রতিরোধকারীদের ছাত্রভঙ্গ করতে গুলি চালায়। রাশিমণি হাজং ও তার সহযোগী ছয় মহিলাসহ ঘটনাস্থলেই ২২ জন আদিবাসী ও দু’জন ব্রিটিশ পুলিশ নিহত হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কুমুদিনীকে রেখে পুলিশ দল ঘটনাস্থল থেকে চম্পট দেয়। লাশ পড়ে থাকলে আবার পুলিশ আসবে_ এই ভয়ে গ্রামবাসী কোনো রকমে লাশগুলো সৎকার করে ভাসিয়ে দেয় সোমেশ্বরী স্রোতে। এতেও শেষ রক্ষা পায়নি গ্রামবাসী। পরদিন ব্রিটিশ পুলিশ দল এসে পুরো গ্রাম তছনছ করে দিয়ে যায়। এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল সেদিন। দীর্ঘ দিন গ্রামটি জনশূন্য হয়ে ছিল।

বছর পনেরো আগে কুমুদিনী হাজংয়ের স্বামী লংকেশ্বর হাজং মারা গেছেন। তিন ছেলে দুই মেয়ে বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছে। নারী নির্যাতনের ঘটনা ও রাশিমণি হাজংয়ের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার গারো পাহাড়ের বহেরাতলী গ্রামে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিসৌধ। নীল আকাশ আর সবুজ প্রকৃতির মাঝে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা স্মৃতিসৌধটি হাজং মাতা রাশিমণির স্মরণে নির্মিত হয় ১৯৯০ সালে। স্মৃতিসৌধের কাছে ভাগ হয়ে গেছে রাস্তাটি। একটি রাস্তা স্মৃতিসৌধের গা ঘেঁষে বামদিক দিয়ে চলে গেছে বিপিনগঞ্জের দিকে। অন্যটি সোজা গিয়ে মিশেছে বিজয়পুর জিরো পয়েন্টে। চারপাশে সবুজের আলিঙ্গন। দূরে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে মেঘে ঢাকা গারো পাহাড়।

 


এ জাতীয় আরো খবর
Developed By ThemesDealer.Com