বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০৭:১১ অপরাহ্ন

বিপন্ন হাজংদের হাহাকার

রির্পোটারের নাম / ৭১ বার
আপডেট সময় : রবিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৯

হিমাদ্রি শেখর ভদ্র : সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, ধর্মপাশা, নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, ময়মনসিংহ জেলার ধোবাউড়া, শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী উপজেলার ছোট-বড় প্রায় ১১০টি গ্রামে প্রায় ১১ হাজার হাজং জনজাতির বসবাস। হাজংরা উপমহাদেশের প্রাচীন আদিবাসী। সমাজবিজ্ঞানী লর্ড ইলিয়ট হাজংদের শান্তিপ্রিয় অথচ স্বাধীনচেতা এবং রাগান্বিত অবস্থায় দুর্দান্ত বলে মন্তব্য করেছেন। এরা সব সময় প্রতিবাদী এবং যেকোনো অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করেছে- অতীতের দিকে ফিরে তাকালে এ কথার সাক্ষ্য পাওয়া যায়।

বিশ্বখ্যাত পরিব্রাজক হিউয়েন সাংয়ের ভ্রমণবৃত্তান্তে আসামের কামরূপ রাজ্যের বিবরণীতে পাওয়া যায় হাজো নগরের নাম। হাজো নগরীতে বসবাসকারীদের বলা হতো হাজোন। শত বছরের বিবর্তনের পর হাজোন থেকে হাজন এবং পরে হাজং নামের সূত্রপাত। নৃতত্ত্ববিদ ক্লোলনেল ইটি ডেলটনের মতে, আসামের হোজাই নগরী হাজংদের আদি বাসভূমি। তারা কাছাড়ি নামক বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত সম্প্রদায়। যদিও এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন হাজংরা কোচ শাখার অন্তর্ভুক্ত জনজাতি। আবার অনেক নৃতাত্ত্বিক মনে করেন, হাজংরা বোড় নামক বৃহত্তর ইন্দো-মঙ্গলয়েড জাতির শাখাভুক্ত। ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে মধ্যযুগ পর্যন্ত বোড় জাতির বসবাস ছিল। ভাষাবিজ্ঞানী ড. গ্রিয়ারসন হাজং ভাষাকে ‘টিবেটো বোরমা ল্যাঙ্গুয়েজ’ আখ্যায়িত করেছেন। তিনি গবেষণাপত্রে বলেছেন হাজং ভাষার সঙ্গে অহমিয়া ও কাছাড়ি ভাষার মিল রয়েছ। সে হিসেবে হাজংরা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম আদিবাসী।

হাজংরা মূলত সনাতন ধর্মের অনুসারী। এ দেশে বসবাসকারী হাজংরা বিভিন্ন পার্বণ, বিয়েশাদি, পারলৌকিক ক্রিয়া সনাতন ধর্মের রীতি অনুযায়ী করে। পাহাড়ি জনজাতি হিসেবে তাদের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি। যদিও বর্তমানে অর্থনৈতিক দৈন্য, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন, জনবল স্বল্পতাসহ বিভিন্ন কারণে হাজং অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে তাদের সংস্কৃতি, নিজস্ব কর্মকাণ্ড বিলুপ্ত হতে চলেছে।  হাজং রমণীদের  চির ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘পাথিন’ এখন আর তাদের ঘরে তৈরি করা হয় না। কারণ পাথিন তৈরির সুতা এখন আর স্থানীয় বাজারে পাওয়া যায় না। হাজং পুরুষদের প্রিয় পোশাক ধুতি ও গামছা। পাথিনের অভাবে হাজং রমণীরা এখন বাঙালি রমণীদের মতো শাড়ি পরেন।

অতীতে হাজংরা বিপুল অর্থবিত্তের মালিক ছিল। কিন্তু বর্তমানে তারা খুবই দৈন্য দশায় দিন যাপন করছে। একটু শিক্ষিত এবং সচ্ছল যারা, তারা শহরে পরিবার নিয়ে বাস করছে। আর যারা গ্রামে রয়েছে তাদের অবস্থা শোচনীয়। তারা অশিক্ষা, কুসংস্কার, অসচেতনতাসহ নানান সমস্যায় জর্জরিত। ১৯৪৯-৫০ সালে হাজংরা বিদ্রোহী হয়ে উঠলে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার হাজংদের এই মাটি থেকে চিরতরে বিদায় করার বিভিন্ন রকম অপচেষ্টা করে। এর মধ্যে ছিল স্থানীয় বাঙালিদের সহযোগিতায় সহজ-সরল হাজংদের বাড়িতে গোপনে ভারতীয় পণ্য রাখা। পরে অবৈধ ভারতীয় পণ্য রাখার অপরাধে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গিয়ে শারীরিক নির্যাতন করে টাকাপয়সা আদায় করা। হাজং অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে দেশের বিভিন্ন  স্থান থেকে স্যাটেলার বাঙালিদের স্থানান্তরিত করেও তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়। পাকিস্তান সরকারের  প্রত্যক্ষ মদদে তৎকালীন ইপিআর বাহিনীর সহায়তায় স্যাটেলার বাঙালিরা হাজংদের ওপর বিভিন্ন নির্যাতন চালায়। যে কারণে অসংখ্য হাজং পরিবার ১৯৫০-এর পর ভারত চলে যায়।

এ দেশে বসবাসকারী হাজংরা তাদের পূর্বপুরুষদের শ্রমেঘামে আবাদ করা জমিতে এখনো চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। যে জমিটুকু তাদের রয়েছে সেগুলোও ওপরও একশ্রেণির ভূমিলোভী মানুষের লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে। এসব ঘটনা হাজংদের বিভিন্ন সময় বিদ্রোহী করে তুলেছে। এর মধ্যে ১৯৪৬ সালের টংক আন্দোলন অন্যতম। টংক হলো জমিদার কর্তৃক নির্ধারিত খাজনা। জমিদার জমিতে ফসল ফলানোর আগে কৃষকদের এই খাজনা নির্ধারণ করে দিতেন। জমিতে ফসল হোক বা নো-হোক কৃষককে এই খাজনা পরিশোধ করতে হতো। পরিশোধ না করলে জমিদারদের হয়ে ব্রিটিশ ইস্টার্ন রাইফেলের লোকজন বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাজির হতো এবং তরুণ-তরুণীদের ধরে নিয়ে যেত। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি তারা কুমুদিনী হাজংকে স্থানীয় ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। সে সময় তার আর্তচিৎকার শুনে হাজং মাতা রাশিমণি এগিয়ে যান।

এ সময় অপ্রস্তুত  রাশিমণির কাছে অস্ত্র ছিল না। তার পরও তিনি দেশীয় তির-ধনুক নিয়েই  মরণপণ লড়াই করেন। লড়াইয়ে কুমুদিনী হাজং মুক্ত হন ঠিকই কিন্তু শহীদ হন প্রতিবাদী নারী রাশিমণি, সুরেন্দ্র হাজংসহ নাম-না-জানা আরো অনেকে। হাজংদের এই প্রবল প্রতিরোধ যুদ্ধের পর তৎকালীন কর্তৃপক্ষ টংক প্রথা স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করে। কিন্তু তার পরও হাজংদের নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। ১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী উল্লেখিত অঞ্চলে হাজংদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। বর্তমানে এ সংখ্যা কমে অর্ধেকে এসে ঠেকেছে। এখন প্রায় ১১৫টি গ্রামে বিছিন্নভাবে হাজংরা কোনোমতে বসবাস করছে। বাকি গ্রামগুলো এখন হাজংশূন্য।


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesWala.Com