রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২০, ০৭:২৩ পূর্বাহ্ন

হাজং মাতা রাশিমণি এক বিপ্লবী ইতিহাস

রির্পোটারের নাম / ৮২৫ বার
আপডেট সময় : শনিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৯

নিউজ ডেক্স : ‘ময় তিমৗ, ময় জানি তিমৗদলৗ মান। ময় রক্ষা কুরিব না তে মরিবু। তুরা থাক তুমলৗ নীতি নিয়ৗ বুইয়ৗ থাক’ অর্থাৎ আমি নারী, আমি জানি নারীর সম্ভ্রমের মান। নারীর মান আমি রক্ষা করবো, নয় মরবো। তোরা থাক তোদের নীতি নিয়ে বসে। টংক আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবী নেত্রী রাশিমণি হাজং’র উক্তি। টংক আন্দোলনে কুমুদিনী হাজংকে বাঁচাতে যাওয়ার প্রেক্ষাকালে তিনি সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন।

কুমুদিনী হাজংকে নিয়ে নির্মাতা রাজন কান্তি তালুকদার এর ডকুমেন্টারি ফিল্ম ‘আগুনের গ্রহণ’। কুমুদিনী হাজং’সহ সেকাল একালের হাজং সম্প্রদায়ের মুখে বর্ণিত কথ্যে চিত্রিত হয়েছে টংক আন্দোলন, কুমুদিনীর প্রতীক হয়ে উঠার গল্প এবং হাজংমাতা রাশিমণি’র বীরত্বকথা। সেই কথ্যের আলোকেই রাশিমণি সম্পর্কে লেখার অভিপ্রায়। উনিশ শতকের শেষ ভাগে গারো পাহাড়ের পাদদেশে অজ্ঞাত এক হাজং পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রাশিমণি হাজং। বর্তমান ময়মনসিংহ বিভাগের ধোবাউরা থানার মাইজপাড়া গ্রামে তিনি বড় হতে থাকেন। উল্লেখ্য, তাঁর জন্ম তারিখ ও স্থান নিয়ে বিভিন্ন তথ্য বিভ্রান্তিকর। রাশিমণি হাজং এর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। পারিবারিক অস্বচ্ছলতার জন্যে বর্ণমালা শিক্ষার বাইরের গণ্ডি তিনি পার হতে পারেন নি। কিশোরীর দুয়ার পার হওয়ার আগেই মাত্র পাঁচ মণ ধান ও নগদ দশ টাকার বিনিময়ে তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। স্বামী জ্ঞানেন্দ্র হাজং (ধাপা) ছিলেন নিঃস্ব টংক যুবক। খুব অল্প সময়ে সংসারের সমস্ত বোঝা রাশিমণি’র উপর ফেলে ধাপা বিদায় নেন। অল্পদিনে বিধবা হওয়ার গ্লানি ও দারিদ্র্য রাশিমণিকে অসহনীয় কষ্টে ফেলে দেয়। জীবন রক্ষার্থে ধান বুনা, কাটা, সিদ্ধ, রোদে শুকানো, ঢেঁকিতে কুটা, চাল তৈরি, হাঁটে নিয়ে গিয়ে বিক্রি সবই করেছেন। রাশিমণি কাঠ সংগ্রহ করে বিক্রি করেছেন, আদিবাসী কাপড়-ওড়না বুনে হাজং পাড়ার মেয়েদের কাছে বিক্রি করেছেন। প্রচলিত রয়েছে, নিঃসন্তান বিধবা রাশিমণিকে সমাজ ডাইনি বলেও নির্দেশ করেছে। কিন্তু রাশিমণি হাল ছাড়েন নি।

আনুমানিক ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয় রাশিমণির। স্বামীর নাম পাঞ্জি লাল হাজং। দূর্গাপুর থানার কুলন্ডাপাড়া ইউনিয়নের আরাপাড়া নিবাসী। পাঞ্জি হাজং ছিলেন অগ্নি উপাসক, পেশায় কবিরাজ। রাশিমণি নিজেও কিছু তন্ত্রমন্ত্র জানতেন। ছিলেন ধাত্রী কর্মে পারদর্শী। পাঞ্জি হাজং’এর সংস্পর্শে তিনি কবিরাজী বিদ্যা ও ধাত্রী কার্যে দক্ষতা অর্জন করেন। ফলে প্রতিবেশীর ছোটখাট রোগ ও প্রসবকালীন সময়ে তাঁর ডাক পড়ে। সকল মানুষের কাছে যাওয়ার সুযোগ হয়। গারো পাহাড়ের পাদদেশের মানুষদের রোগে শোকে তিনি হয়ে ওঠেন নির্ভরতা ও আশ্রয়স্থল। চল্লিশের দশকে গারো পাহাড়ের পাদদেশ সুসং দূর্গাপুরে সংগঠিত হয় টংক আন্দোলন। টংক আন্দোলন ব্রিটিশ-ভারতের সর্বশেষ গণআন্দোলন। টংক প্রথা হল, ধান কড়ারী খাজনা। টংক আন্দোলনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানা যায়, মূলত সমতল ভূমির গভীর অরণ্য পরিষ্কার করে আবাদী জমি উপযোগী করে তুলেছিল হাজং প্রজারা। নিষ্কর ভূমি হিসেবে রাজ্যের অধিবাসীরা তা ভোগ করছিল। রাজন্যবর্গ এই ফসলের লোভ সামলাতে পারছিল না। ফলে ১৯২৮ সালে জমিদারদের পক্ষে নিষ্কর জমির কর আদায়ের এক আইন পাস হয়। এই আইনের বলে আবাদী জমির উপর ধান আদায়ের জুলুম শুরু হয়। জমিতে ফসল যাই হোক নির্ধারিত পরিমাণ ধান কৃষককে দিতেই হত। সেসময় সোয়া দুই টাকা ছিল প্রতিমণ ধানের দর। টংক অনুসারে সোয়া একর জমির জন্য বছরে সাত থেকে পনের মণ ধান দিতে হত। কিন্তু সেই সময় জোত জমির খাজনা ছিল সোয়া একরে পাঁচ থেকে সাত টাকা মাত্র। ফলে প্রতি সোয়া একরে কৃষকদের বাড়তি এগার থেকে সতের টাকা খাজনা দিতে হত। যদি ফসল নষ্ট হয়ে যায় তবে যেভাবেই হোক কৃষককে জমিদারের পাওনাও মেটাতে হবে। কোন কারণে না দিতে পারলে হাজং প্রজাদের শাস্তি ভোগ করতে হতো। টংক প্রথা নিয়ে হাজং প্রজা ও জমিদারদের মধ্যে বিক্ষিপ্ত অসন্তোষ দানা বাঁধছিল। যা ক্রমশ প্রকট রূপ লাভ করে।

হাজং নেতৃবর্গের একটাই দাবি ছিল ‘জান দিবো কিন্তু ধান দিবো না’। টংক প্রথা নিয়ে বিরোধিতার জন্যেই গোড়া চাঁদ হাজং সহ চারজনকে জেলে যেতে হয়। বছর তিনেক পর তিনজন ফিরে এলেও গোড়া চাঁদ ফিরেনি। গোড়া চাঁদের না ফিরে আসার ক্ষোভে জমিদারদের লাঠিয়াল ও সৈন্য বাহিনীর সাথে হাজং প্রজাদের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ বেঁধে যায়। এমনি এক সময়ে ১৯৩৬ কমরেড মনিসিংহ কলকাতা থেকে নিজ বাড়ি সুসং দূর্গাপুরে এসে বসবাস শুরু করেন। মনিসিংহ এই আন্দোলনে এগিয়ে এলে টংক আন্দোলন বেগবান হয়। প্রচলিত আছে, ১৯৩৭ সালের দিকে রাশিমণি হাজং টংক আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। টংক আন্দোলনের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্য হন। রাশিমণি ছিলেন এ আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবী নেতা। কৃষক সমিতির জঙ্গি কর্মী হিসেবেও তিনি সুপরিচিত ছিলেন। অন্যান্য নারী প্রজারা রাশমণি’কে দেখেই আন্দোলনে উৎসাহিত হয়। অনেকেই টংক আন্দোলন বাহিনীতে যোগ দান করেন। ধীরে ধীরে হাজং নারী পুরুষের ঐক্যে টংক আন্দোলন বিট্রিশদের ভীত ও হিংস্র করে তোলে। ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৪৬ সালে। সকাল বেলা নেত্রকোনা দূর্গাপুর বিরিশিরি থেকে বহেরাতলী গ্রামে হঠাৎ ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল বাহিনীর তাণ্ডব শুরু হয়। বহেরাতলী গ্রামে লংকেশ্বর হাজং ও তার তিন ভাই ছিল টংক আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। ফলে রাইফেল বাহিনী লংকেশ্বর হাজংয়ের বাড়িতে হানা দেয়। লংকেশ্বর ও তার তিন ভাই ততক্ষণে আড়াপাড়ায় মণি সিংহের গোপন আস্তানায় চলে গিয়েছিল। বাহিনী তাদের খোঁজে না পেয়ে স্ত্রী কুমুদিনী হাজংকে জোর করে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। এই সময় জঙ্গি কৃষক বাহিনীর একটি সভা চলছিল। রাশিমণি কুমুদিনীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সংবাদ পাওয়া মাত্রই সব রকমের বাধা ও মতকে উপেক্ষা বলেছিলেন নারীর মান বাঁচাতে তাকে যেতেই হবে। তিনি ছুটে গিয়েছিলেন। রাশিমণির সঙ্গে গিয়েছিলেন বগাউরা গ্রামের দিস্তামনি হাজং, আড়াপাড়ার বাসন্তি হাজং, রণেবালা হাজং, প্রভাবতি হাজং ও পঞ্চমনি হাজংসহ প্রমুখ। পিছন পিছন গেল সুরেন্দ্র হাজং পঁচিশ জন যোদ্ধাকে সাথে নিয়ে। বালুকাময় সুমেশ্বরীর পশ্চিমতীরে রাইফেল বাহিনী আটকা পড়ে। রাশিমণির দল তীর, বর্ষা, বেত, ধনুক ছুড়তে থাকে। তীর ধনুকের আক্রমণ ও খরস্রোতা সোমেশ্বরী পার হয়ে পালিয়ে যাওয়া রাইফেল বাহিনীর পক্ষে কঠিন হয়ে যায়। তারা কুমুদিনীকে ছেড়ে দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে।

রাশিমণিসহ অন্যান্য যোদ্ধাদের দিকে গুলি ছুড়তে থাকে। রাশিমণি হাজং বাঁশঝাড়ের আড়ালে সুযোগের অপেক্ষায় লুকিয়ে থাকে। ব্রিটিশ বাহিনী এদিক সেদিক দৌড়াচ্ছিল। হঠাৎ একজন বাঁশঝাড়ের এখানে আটকে যায়। রাশিমণি জ্বলে ওঠে। কুমুদিনীর জুলুমকারীকে হাতের কাছে পেয়ে দা দিয়ে আঘাত করে। জুলুমকারীর মাথা আলগা হয়ে যায়। পাশের সৈন্য সঙ্গে সঙ্গে রাশিমণির দিকে গুলি ছুঁড়ে। তেজস্বিনী রাশিমণি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সুরেন্দ্র হাজং বর্ষার আঘাতে রাশিমণির হত্যাকারীর প্রাণ কেড়ে নেয়। মূহূর্তে আর একটি বুলেট সুরেন্দ্র হাজং এর প্রাণ কেড়ে নেয়। এভাবে পাল্টাপাল্টি আক্রমণে নিভে যায় বিপ্লবী দুই প্রাণ। প্রাণপ্রিয় দুই সংগ্রামী সৈনিক হারিয়ে বাকী যোদ্ধারা মরিয়া হয়ে উঠে। তারা তাদের অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ চালিয়ে যায়। প্রায় তিনঘণ্টা পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের পর ব্রিটিশ বাহিনী পিছু হটে। বহেরাতলী হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক আন্দোলনমুখর গ্রাম। টংক আন্দোলনের প্রথম নারী শহীদ হল রাশিমণি হাজং। নিঃসন্তান হয়েও রাশিমণি আজ হাজংমাতা। হাজং-বাঙালি নির্বিশেষে সকলের পূজনীয়। সমগ্র নারী বিপ্লবের পথ নির্দেশক। শুধু গাড়ো পাহাড়ের পাদদেশে নয়, হাজংমাতা রাশিমণি আজ সমগ্র নারী সংগ্রামের প্রেরণা। হাজংমাতা রাশিমণি আজ একটি ইতিহাস।

লেখক – জয়শ্রী সরকার :


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesWala.Com