বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০৮:২১ অপরাহ্ন

মিরপুরের মুক্তিযুদ্ধ : কিছু স্মৃতি, কিছু কথা

রির্পোটারের নাম / ৫৫ বার
আপডেট সময় : শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

ডেক্স নিউজ : ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেল। কিন্তু তখনো ঢাকার মিরপুর স্বাধীন হয়নি। এখানে যুদ্ধাপরাধী অবাঙালিরা অস্ত্র জমা দেয়নি। মিরপুর স্বাধীন হয়েছে ৩১ জানুয়ারি, ১৯৭২ সালে। এর আগে, ১৯৭০ সালে ৭ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করার পর মিরপুরে মুক্তিযুদ্ধ কার্যত শুরু হয়ে যায়। ২৩ মার্চ ১৯৭১ সালে চার ছাত্রনেতার আহ্বানে আমরা ‘স্বাধীন বাংলাদেশ দিবস’ পালন করি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর মিরপুরের বাঙালিদের সাহস অনেক বেড়ে যায়। সেই সময় আমরা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ গঠন করেছিলাম। স্বেচ্ছাসেবক লীগ প্রধান ও রাজনীতিক মরহুম আবদুর রাজ্জাক বাংলা কলেজে এসেছিলেন। আমরা প্যারেড দিয়ে স্যালুট দিয়েছিলাম এবং তিনি স্যালুট গ্রহণ করেন।

মনে হলো, যুদ্ধের দামামা বেজে উঠে এবং বাঙালিদের আর দমিয়ে রাখা যাবে না। জনগণ অপেক্ষা করেছে কবে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২৩ মার্চ আমাদের মিরপুর ৬ডি/১৯-২ নম্বর বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হলো। মিরপুর পুরো এলাকা ছিল বিহারিবসতি। ৯৫ শতাংশ বাড়িতে তারা পাকিস্তানি পতাকাই উত্তোলন করেছিল। পুরো ৬ নম্বর সেকশনে আমাদের বাড়িসহ মাত্র ২-১ বাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। বিকেলে তৎকালীন ইপিআরের গাড়ি আমাদের বাড়ির সামনে এসে থামল। বাংলাদেশের পতাকা উড়তে দেখে ইপিআরের সদস্যরা বাবাকে ডাকলেন এবং ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, পতাকা নামিয়ে ফেলুন। আপনাদের সাহস দেখে আমরা খুশি। তবে তখন আমরা পতাকা নামাইনি। সন্ধ্যার দিকে আমি ও আমার ভাই ‘জয়বাংলা’ বলে পতাকা নামিয়ে ফেললাম।

২৪ মার্চ অবস্থা আরো খারাপ। বাঙালিদের শুধু স্বপ্ন, কবে বঙ্গবন্ধু দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন। আমার (মরহুম) আব্বাজান সকালে বাজার থেকে এসে বললেন, আর এখানে থাকা যাবে না। ১১ নম্বর সেকশনে একজন পাঞ্জাবি আর্মি অফিসারের কাছে শুনেছি, ‘শেখ মুজিবকো পাওয়ার নেহি দেগা। টিক্কা খান গভর্নার হুয়া, বিহারি ভাইলোগো মাত ডরো। আরো ইধার বাঙালি ঘরমে চিকা লাগাও।’ এ কথা শুনে আমরা তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে বাড়ি ছেড়ে সবাই চলে গেলাম। আওয়ামী লীগ নেতা ও তদানীন্তন এমএনএ ডা: মোশাররফ হোসেন বাঙালিদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার জন্য অনেক সহযোগিতা করেছেন। বাবার নির্দেশে কবি মেহেরুন নেছা ও তার পরিবারকে আমাদের সাথে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলাম আমাদের খুবই পরিচিত, ৬-ডি/১২-৮ নম্বর বাড়িতে। কিন্তু তারা আমাদের সাথে এলেন না। এই মহীয়সী নারী ও তাদের পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করে বিহারিরা। আকতার গুণ্ডাসহ যুদ্ধাপরাধীদের নেতৃত্বে ২৭ মার্চ আমাদের বাড়ি ও আরো অনেক বাঙালির বাড়িতে হামলা হয়েছিল, কিন্তু তারা আমাদের পায়নি। ২ নম্বর সেকশনে অনেককে হত্যা করে। আমরা সেনপাড়া পর্বতায় এসে এক বাড়ির বারান্দায় রাত কাটালাম।

২৫ মার্চ সকালে আমি ও ভাই ভয়ে ভয়ে বাসায় গেলাম জরুরি কিছু জিনিসপত্র আনার জন্য। একজন অবাঙালি আমাদের দেখে অবাক। অতি সত্বর এলাকা ত্যাগ করতে বললেন। দুই ভাই তাড়াতাড়ি চলে এলাম। আসার সময় দেখলাম বেশ কিছু অবাঙালি ছোরায় ধার দিচ্ছে। তাড়াতাড়ি বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় চলে এলাম। রাতে আমরা সবাই এক বাড়ির বারান্দায় ছিলাম। ২৫ মার্চ রাতে প্রচণ্ড গোলাগুলির আওয়াজ শুনি। সেই রাতে পুরো ঢাকা শহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ চালায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয়।

২৬ মার্চ সকালে সেনাবাহিনীর সহায়তায় অবাঙালিরা সেনপাড়া পর্বতায় হামলা চালালে আমরা পিতা-মাতা, ভাইবোনসহ শত শত বাঙালি মিরপুর মাজারের পশ্চিমে, কাউন্দিয়ার দিয়ে দৌড়াতে থাকি। মাথার ওপর দিয়ে পাখির মতো গুলি চলতে থাকে। সেদিন আমরা বাঁচব বলে আশা করতে পারিনি। কিছুক্ষণ পর গুলি ছোড়া বন্ধ হলো। শত শত বাঙালি চরে এক মাঠে আশ্রয় নিলাম। সেদিন সারা দেশে কার্ফু জারি করা হয়েছিল। টিক্কা খান তখন গভর্নর। সবাই কোনো রকমে রাত যাপন করলাম। ২৭ মার্চ শহীদ জিয়াউর রহমান কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণায় আমরা কিছুটা সাহস পেলাম। সেদিন ভোরে বাবা ইউসুফ চাচার সহায়তায় একটা বজরা ভাড়া করেন। এতে প্রায় ৫০ জন বাঙালি মিলে জিঞ্জিরার উদ্দেশে রওনা হলাম। ইউসুফ চাচা ও আমার বাবা তখন ৬ নম্বর সেকশনে আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য। বর্তমানে তার ছেলে ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সভাপতি।

সেদিন পথে আমিন বাজার পুলের ওপর আর্মি আমাদের বজরার দিকে বন্দুক তাক করে ছিল। আমরা সবাই এটা দেখে কলেমা পড়েছি। ভেবেছি, এবার আর বাঁচা যাবে না। কিন্তু তারা আর গুলি করেনি। শুনছি আমরা চলে যাওয়ার পর আর্মি শত শত রাউন্ড গুলি ছুড়েছিল। বেলা ২টার দিকে আমরা জিঞ্জিরার মান্দাইল এসে পৌঁছলাম। এখানে হাজার হাজার বাঙালি আশ্রয় নিয়েছিল। খলিফাপাড়ায় আমাদের এক আত্মীয়ের বাসায় থাকার ব্যবস্থা হলো। ফজরের নামাজের পর আবার পাকবাহিনী আক্রমণ চালায়। সারা এলাকায় পাখির মতো গুলি ছোড়ে। এক মসজিদে আশ্রয় নিলাম। দুই ঘণ্টা পর গুলির আওয়াজ থেমে গেল। দেখলাম, শত শত বাড়িতে ওরা আগুন দিয়েছে, গরু পুড়ে ‘কাবাব’ হয়ে গেছে। অনেক মানুষ রাতে এক বাসায় রাত কাটাই। পাশের বাড়ির এক ব্যক্তির আর্তনাদ শুনেছি। তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে পরে মারা যান। কয়েক দিন থাকার পর আমরা ঢাকার সিদ্দিক বাজারে অবস্থান করলাম। সেখানে আওয়ামী লীগ নেতা রাজু ভাই বাসা ঠিক করে দিলেন।

দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠক হিসেবে কাজ করেছি। স্থানীয় নেতা ছিলেন ক্যাপ্টেন নাসের। আমাদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের সভা হতো। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়ে গেল। আমরা এক বিরাট মিছিল বের করি। কিন্তু মিরপুর স্বাধীন হয়নি। বিহারিরা অস্ত্র জমা দেয়নি। গোটা মিরপুরে বিহারিদের (অবাঙালি) ভারতীয় আর্মি পাহারা দিয়েছে। ভারতের আর্মি ও বিহারিদের ভাষা এক হওয়ায় সুযোগে অনেক অবাঙালি দুর্বৃত্তকে ভারতের সৈন্যরা মিরপুর থেকে পার হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। অবশ্য সবাই নয়। ডা: মোশাররফ হোসেন এমএনএ আমাদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার দায়িত্ব দেন, যাতে কোনো অপরাধী মিরপুর থেকে পালাতে না পারে। আমাদের মিরপুর ২ নম্বরে দায়িত্ব দেয়া হয়। আমরা কয়েকজন গাড়ি চেক করি। অনেক বিহারির গাড়ি ব্যাক করিয়ে দিই। সেদিন একটা গাড়ি চেক করতে গেলে কয়েকজন অবাঙালি আমাদের আক্রমণ করে। আমি ও মুসা কোনো রকমে জান বাঁচিয়ে মিরপুর ত্যাগ করি। সেদিন মিরপুরে চিত্রনির্মাতা ও লেখক জহির রায়হান এসে আর ফেরত যাননি। যা হোক, মুক্ত হওয়ার পর আমরা মিরপুরে প্রবেশ করলাম। এসে দেখি পুরো কোয়ার্টার বিহারি ভর্তি। ডা: মোশাররফ হোসেনের নির্দেশে ওদের বাড়ি খালি করতে বলা হলো, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালিরা থাকতে পারে। সে মোতাবেক, আমাদের নির্দেশে তারা বাড়ি খালি করে দিলে বাঙালিদের বাড়িতে ঢুকিয়ে দেয়া হলো।

মিরপুরে মুক্তিযুদ্ধের সময় যাদের অবদান আছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- ডা: মোশারফ হোসেন, হারুন মোল্লা, এস এ খালেক, মরহুম আবু সাইদ, মরহুম কাজী সাহেদ, কমান্ডার শহিদ মামা, শহীদ কবি মেহেরুন নেছা, শহীদ রফিক, শহীদ শফিক (মেহেরুন নেছার ভাই), মমতাজ স্যার, মরহুম বাকি দেওয়ান, মরহুম শুকুর চৌধুরী, নজরুল ইসলাম, ওসমান গনি, মরহুম আলম মামা, মরহুম ইউসুফ চাচা, হোসেন মোল্লা, শেখ শফিউর রহমান, শাহাৎ হোসেন, মরহুম হাবিবুর রহমান, মো: শফিকুল মোল্লা, কাজী বজলুর রহমান, মো: ওয়াজুদ্দিন, মো: মুসা প্রমুখ।

লেখক : সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধা


এ জাতীয় আরো খবর
Theme Created By ThemesWala.Com